পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারে ভারতের অগ্রগতি, চীন এগোচ্ছে দ্রুত
বিশ্বের পারমাণবিক শক্তির ভারসাম্য এখনো মূলত কয়েকটি বৃহৎ শক্তিধর দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ায় পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতা নতুন করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্টকহোমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসআইপিআরআই (স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এর ২০২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তি এখনো রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার হাতে আনুমানিক ৪ হাজার ৪০০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩ হাজার ৭০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। গত এক বছরে উভয় দেশের অস্ত্রভাণ্ডার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও রাশিয়ার ওয়ারহেডের সংখ্যা ৯১টি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এসআইপিআরআই জানিয়েছে, এই বৃদ্ধি মূলত নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির ফল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে এশিয়ায়। চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এক বছরে ২০টি বেড়ে ৬২০টিতে পৌঁছেছে। ফলে দেশটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল পারমাণবিক শক্তিগুলোর অন্যতম হিসেবে তার অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।
একই সময়ে ভারত ও উত্তর কোরিয়া তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে ১০টি করে নতুন ওয়ারহেড যুক্ত করেছে। এর ফলে ভারতের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯০ এবং উত্তর কোরিয়ার ৬০। অন্যদিকে পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডার ১৭০টি ওয়ারহেডে অপরিবর্তিত রয়েছে। একইভাবে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারও ৯০টিতে স্থির রয়েছে।
প্রতিবেদনে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়, পারমাণবিক অবকাঠামোর বিস্তার ও সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কৌশলগতভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।
রাশিয়ার অ্যাঙ্গারস্ক, নভোউরালস্ক, সেভেরস্ক এবং জেলেনোগর্স্কে অবস্থিত স্থাপনাগুলো দেশটির শক্তিশালী পারমাণবিক জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে চীন দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার আওতায় লানঝৌ ও হানঝংয়ে সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং জিনতা ও জিউছুয়ানে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্রকল্প গড়ে তুলেছে।
ইউরোপেও ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। যদিও এসব স্থাপনার অধিকাংশ বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়, তবুও বৈশ্বিক পারমাণবিক জ্বালানি চক্রে এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। ভারতের কালপাক্কাম, তারাপুর ও ট্রম্বে এবং পাকিস্তানের কাহুটা ও চাশমা দেশ দুটির পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক সক্ষমতার তুলনায় দেখা যায়, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রে মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যায় চীন স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। এসআইপিআরআইর তথ্য অনুযায়ী, চীনের এ ধরনের ওয়ারহেড রয়েছে ৫০৯টি। ভারতের রয়েছে ১০৪টি এবং পাকিস্তানের ১২৬টি।
সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান শক্তিশালী। দেশটির সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে ৭২টি। ভারতের রয়েছে ১২টি, আর পাকিস্তানের বর্তমানে এ ধরনের কোনো ওয়ারহেড নেই।
আকাশপথে বহনযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও তিন দেশই সক্ষমতা বজায় রেখেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের রয়েছে ৪৮টি, পাকিস্তানের ৩৬টি এবং চীনের ২০টি ওয়ারহেড।
এসআইপিআরআইর সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, এশিয়ার পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় চীন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে ভারত ধীরে ধীরে তার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তান আপাতত বিদ্যমান অস্ত্রভাণ্ডার স্থিতিশীল রেখেছে। ফলে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগামী বছরগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।