মধ্যপ্রাচ্যে ভালো-মন্দের দোলাচলে অনিশ্চিত ২০২৬
গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পূর্বাভাস দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বেশিরভাগ সময়ই হতাশাবাদী অবস্থান নিয়েছেন। সেই আশঙ্কা গত দুই বছরে অনেকাংশেই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে অঞ্চলটিতে সীমিত হলেও কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা সাময়িক স্বস্তি এনেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়নি এবং সিরিয়াও এখন পর্যন্ত সর্বাত্মক সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ একদিকে যেমন অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে বড় ধরনের অস্থিরতা ও বিপর্যয়ের ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতে গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি টিকে থাকতে পারে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শান্তি উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখতে পারেন। এতে আস্থা ফিরে পেয়ে আরব ও মুসলিম দেশগুলো গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে সম্মত হতে পারে এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের পথ তৈরি হতে পারে। পুনর্গঠনের স্বার্থে গাজায় সক্রিয় ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ত্যাগে বাধ্য হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই অনুকূল পরিবেশে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের সংস্কার দাবিও বাস্তব রূপ পেতে পারে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মারওয়ান বারগুতির মতো তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য কোনো নেতা গাজার শাসনভার গ্রহণ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সময়ে ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে একটি মধ্যপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিরিয়া ও লেবাননের সঙ্গে অ-আগ্রাসন চুক্তি, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে নতুন শান্তি প্রক্রিয়া এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে ইরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর যদি কোনো সংস্কারপন্থি নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসে, তবে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়, তবে তা গোটা অঞ্চলের উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকেও মোড় নিতে পারে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—উভয় সমাজেই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি জনসমর্থন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় হামাস অস্ত্র ত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়ে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন ব্যর্থ হতে পারে এবং ইসরায়েল পুনরায় গাজায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।
যুদ্ধ পুনরায় ছড়িয়ে পড়লে মিশরের দিকে শরণার্থী স্রোত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এর ফলে সিনাই উপদ্বীপে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েল যদি আবার ইরানে হামলা চালায়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আব্রাহাম চুক্তি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।
ইরানে কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা জোরদার হতে পারে। সিরিয়ায় কুর্দি ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার অজুহাতে ইসরায়েলে নির্বাচন স্থগিত হলে পশ্চিম তীরে নতুন করে ইন্তিফাদা শুরুর আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই চরম দৃশ্যপটের মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করবে। গাজায় হয়তো বড় ধরনের যুদ্ধ আর শুরু হবে না, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠনও এগোবে না। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠিত না-ও হতে পারে। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমিত আকারের সংঘর্ষ চলতেই থাকবে এবং গাজার প্রশাসন কার্যত দুর্বল অবস্থায় থাকবে।
একইভাবে ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটবে না, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাবে না, তবে সবকিছু সত্ত্বেও একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানো যেতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।