‘জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের লড়াই’
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা সরকারের পদত্যাগের আন্দোলন নয়; এটি ছিল একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা বিলোপের ঐতিহাসিক লড়াই-এ মন্তব্য করেছেন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ।
তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়েই দেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। অথচ সেই সংবিধানের অন্যতম কারিগর ড. কামাল হোসেনকে আজ আবার সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা মূলত পুরোনো নেতৃত্ব ও পুরোনো বন্দোবস্ত পুনর্বাসনেরই অংশ।
শুক্রবার বিকেলে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য পিআইবি আয়োজিত নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ফারুক ওয়াসিফ প্রশ্ন তুলে বলেন, দেশে কি আর কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ নেই? যিনি ৭২-এর সংবিধানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ তৈরির আতুরঘর গড়ে তুলেছিলেন, তাকেই আজ তথাকথিত সুশীল সমাজ আবার সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছে-এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সাংবাদিকতার বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে পিআইবি মহাপরিচালক বলেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্ট, অনিরাপদ এবং পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের শিকার হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ৫৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং প্রায় দেড় হাজার সাংবাদিক বিভিন্নভাবে পঙ্গু হয়েছেন।
তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের নয় মাসে ১৩ জন সাংবাদিক শহীদ হন। অথচ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শেষ দুই সপ্তাহেই ছয়জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, সাংবাদিকরা একই সঙ্গে জনগণের পক্ষে এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সাংবাদিকরা ছিলেন জনতার শিবিরেও, আবার ক্ষমতার শিবিরেও-এই দ্বৈত অবস্থানের কারণেই তারা টার্গেট হয়েছেন।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন যে আগের রাতেই সম্পন্ন হয়ে যাবে-এ কথা জানা সত্ত্বেও কিছু সম্পাদক ও গণমাধ্যম একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিল। সেই ব্যর্থতার ফলেই আজকের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এখনো গণমাধ্যমের একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পুরোনো কৌশল ও পুরোনো নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে পিআইবি মহাপরিচালক বলেন, শুধু ভোট আয়োজনই যথেষ্ট নয়-সংস্কার হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রার্থীরা সংসদে গিয়ে বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন কি না, দলীয় কর্মীদের কী নির্দেশনা দিচ্ছেন-এসব প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ভোটারের জানার অধিকার নিশ্চিত না হলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এই মাটি শহীদের রক্তে উর্বর হয়েছে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো-এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সন্তানকে রাজপথে জীবন দিতে না হয়।
পিআইবির অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রশিক্ষক মোহাম্মদ শাহ আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পিআইবির রিসোর্স পারসন জিয়াউর রহমান ও সুলতান মাহমুদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল আউয়াল, সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, দৈনিক রাজশাহী সংবাদের প্রধান সম্পাদক ডা. নাজিব ওয়াদুদ এবং রাজশাহী টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শ. ম সাজু প্রমুখ।