‘বাবার ওষুধের টাকা আসবে কোথা থেকে?’
রাজশাহী মহানগরীর ব্যস্ততম রেলগেট এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে চরম ক্ষোভ ও মানবিক হাহাকার তৈরি হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে। পথচারীদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে অবৈধ স্থাপনা সরানোর এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও আকস্মিক দোকান ভেঙে দেওয়ায় কয়েক দশকের পুরোনো জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বহু প্রান্তিক মানুষ। অভিযানের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি আবেগঘন ভিডিওতে এক শিক্ষিত তরুণ ব্যবসায়ীর কাতর আর্তি-‘আগে কাজ দেন, তারপর দোকান ভাঙেন’—মুহূর্তেই নেটিজেনদের দৃষ্টি কেড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিযান সূত্রে জানা গেছে, নগরীর যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্তকরণের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রেলগেট সংলগ্ন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয়সংলগ্ন এলাকার ফুটপাতের বেশ কয়েকটি দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘ সময় ধরে ওই স্থানে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করে পরিবার চালানো সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তোলা ভিডিওতে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত এক যুবক কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে নিজের পরিবারের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরছেন। তিনি জানান, এই ফুটপাতের সামান্য উপার্জনেই তাঁর বাবা তাঁকে বহু কষ্টে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। লেখাপড়া শেষ করে কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পরিবারের হাল ধরতে তিনি নিজেই বাবার ক্ষুদ্র ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তাঁর বাবা একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং প্রতিদিনের উপার্জনের সিংহভাগই চলে যায় বাবার ব্যয়বহুল ওষুধের পেছনে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসন ছাড়া হুট করে দোকান ভেঙে দেওয়ায় তাঁদের পুরো পরিবার এখন চরম অনাহারের মুখোমুখি।
একই ভিডিওতে এক বয়োবৃদ্ধ নারীকে আহাজারি করতে দেখা যায়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবং ধারদেনা করে তাঁরা গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ছোটখাটো ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। কোনো ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে দোকান ভেঙে ফেলায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়া কীভাবে সম্ভব হবে, তা ভেবে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সচেতন নাগরিকরা ফুটপাত দখলমুক্ত করে হাঁটার পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে যেমন স্বীকার করছেন, তেমনই কোনো প্রকার বিকল্প পুনর্বাসন বা হকার্স মার্কেট তৈরি ছাড়া নিম্নআয়ের মানুষের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন গুঁড়িয়ে দেওয়াকে চরম অমানবিক হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের কাছে পুনর্বাসনের সুযোগ প্রদান এবং ফুটপাত শৃঙ্খলার পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার জোর দাবি জানিয়েছেন।