সিলিন্ডার সংকটে বিপাকে ভোক্তা
নতুন করে দাম সমন্বয়ের ঘোষণার সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকেই রাজশাহী, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ গোটা উত্তরাঞ্চলে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার নিয়ে এক পরিকল্পিত সংকট তৈরি করা হচ্ছে। কৃত্রিম ঘাটতির সুযোগে ভোক্তাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিইআরসি যখনই বর্ধিত মূল্য ঘোষণা করে, তার পরপরই জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বাজারে উধাও হওয়া সিলিন্ডারের সরবরাহ আবার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পায়। তৃণমূলের ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের স্পষ্ট অভিযোগ, এলপিজি আমদানিকারক ও বিপণনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগসাজশের কারণেই প্রতি দফায় দাম বৃদ্ধির প্রাক্কালে বাজারে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে।
উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক জেলাগুলোর খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন দর চূড়ান্ত করার অন্তত দশ থেকে পনেরো দিন আগে থেকেই পরিবেশক বা ডিলার পর্যায় থেকে সরবরাহ ব্যাপকভাবে ছেঁটে ফেলা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি দোকানের জন্য যেখানে নিয়মিত সিলিন্ডারের চালান প্রয়োজন হতো, সেখানে চাহিদার অর্ধেকেরও কম সরবরাহ মেলে। ফলে খুচরা পর্যায়ে তৈরি হয় তীব্র হাহাকার। বাধ্য হয়ে একদিকে যেমন দোকানিদের অতিরিক্ত দামে কিনতে হয়, অন্যদিকে এর সরাসরি চাপ গিয়ে পড়ে খুচরা ক্রেতার ঘাড়ে। অথচ কমিশনের বর্ধিত দাম কার্যকর হওয়া মাত্রই ডিলাররা কোনো রকম ঘাটতি ছাড়াই ভ্যানে ভ্যানে সিলিন্ডারের সরবরাহ আবার পুরোদমে সচল করে দেন।
চলতি বছরের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির চিত্র বিশ্লেষণ করলে এই কারসাজির ধারাবাহিক রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গেল এপ্রিল মাসের শুরুতে প্রথম দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হয় এবং একই মাসের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় দফায় আরও ২১২ টাকা বাড়িয়ে তা নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। পরবর্তী মাসগুলোতে দর কিছুটা ওঠানামা করলেও গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা পুনর্নির্ধারণ করে। তবে সরকারি এই দাম ঘোষণার বহু আগে থেকেই মাঠপর্যায়ে সিলিন্ডার উধাও করে দেওয়া হয়। রাজশাহী, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটি সিলিন্ডারে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের।
মূল্যের এই অযৌক্তিক উল্লম্ফন সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের পারিবারিক বাজেটে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বগুড়া মহানগরের বেজোড়া এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন আক্ষেপ করে জানান, আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা ভারী হয়ে ওঠায় তিনি বাধ্য হয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কেনা বন্ধ করে পরিবারকে মাটির চুলায় রান্নার কথা বলেছেন। তবে সেখানেও সংকট পিছু ছাড়েনি, কারণ বাজারে রান্নার বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠের খড়ির দামও চড়া।
এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি ভূমিকা নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। বগুড়া মহানগরের খুচরা বিক্রেতা রেহান হোসেন ও সুমন তালুকদার জানান, কৃত্রিম সংকটের সময় ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার না পেয়ে তাঁরা দোকান পরিচালনা করতেই হিমশিম খান। অথচ ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানগুলো পরিচালিত হয় মূলত ছোট ছোট খুচরা দোকানে। যারা হাজার হাজার সিলিন্ডার আটকে রেখে মূল কারসাজি করে, তাদের ধারেকাছেও কোনো তদন্ত পৌঁছায় না। ফলে মাঠপর্যায়ের জরিমানা ও তদারকি কেবলই একপেশে ও লোকদেখানো তৎপরতায় রূপ নিয়েছে।
অবৈধ মজুতের বিষয়ে পরিবেশকরা নিজেদের দায় অস্বীকার করে পুরো আঙুল তুলেছেন আমদানিকারক ও মূল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। বগুড়া মহানগরের পরিবেশক অভি মোদক জানান, ডিলারদের এমন কোনো সুরক্ষিত গুদাম থাকে না যেখানে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে শত শত সিলিন্ডার অবৈধভাবে আটকে রাখা সম্ভব। সংকট যা তৈরির তা ওপরের পর্যায় থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
একই সুরে বগুড়া জেলা এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতির সভাপতি আসলাম খাঁন বলেন, নতুন দাম ঘোষণার সময় এলেই শীর্ষ কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজিবাহী জাহাজ সমুদ্রে আটকা পড়ার কথা কিংবা খালাসে জটিলতার অজুহাত দাঁড় করায়। সেই অজুহাতে তারা ডিলার পর্যায়ে চালান বরাদ্দ অর্ধেকে নামিয়ে আনে। পরিবেশকরা সরাসরি কোম্পানির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাঁদের হাত-পা বাঁধা থাকে।
সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে যমুনা অয়েল পিএলসির বগুড়া বিভাগীয় বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক সাইদুল আলম চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি মন্তব্য করেন, সরবরাহ ওঠানামা করা একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং এটি কোনো সুনির্দিষ্ট সময় মেনে হয় না। কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধের কারণ দেখিয়ে তিনি এর চেয়ে বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে শীর্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আচরণেও প্রকাশ পেয়েছে চরম উদাসীনতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা। কমিশনের পেট্রোলিয়াম শাখার পরিচালক মো. দিদারুল আলম এ বিষয়ে নিজে কোনো মন্তব্য না করে কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানান। পরবর্তীতে দাম বৃদ্ধির ঠিক আগে আগে প্রতিবার কেন এলপিজির বাজারে এই তীব্র কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়-এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বিষয়টি চট করে বলে ফেলার মতো নয় এবং প্রশ্ন করা সহজ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে এর ব্যাখ্যা দেওয়া জটিল।
শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন নীরবতা ও এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলের কারণে উত্তরের বাজারে এলপিজি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, যার চূড়ান্ত খেসারত প্রতিদিন দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।