কানাডায় ‘ভাসমান’ দিন কাটছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার
টানা দীর্ঘ নয় বছর ধরে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন দেশের সাবেক বিতর্কিত ও আলোচিত ২১তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা)। বর্তমানে তিনি কানাডার টরন্টোতে কনিষ্ঠ কন্যার সঙ্গে অবস্থান করলেও দেশটিতে কোনো স্থায়ী বসবাসের আইনি মর্যাদা পাননি। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ও সাজানো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে কানাডায় তাঁর স্থায়ী অভিবাসন বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি (পিআর) প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে। এর ফলে কোনো বৈধ স্ট্যাটাস ছাড়া সেখানে কার্যত একজন ‘ভাসমান শরণার্থী’ হিসেবে দিনাতিপাত করছেন তিনি। একই সঙ্গে দুই বছরের বেশি সময় ধরে আবেদন করেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাসপোর্ট নবায়ন না পাওয়ায় দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও থমকে আছে।
সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে পদত্যাগ, দেশত্যাগ, পেনশন বঞ্চনা এবং বর্তমান চরম অনিশ্চিত জীবন নিয়ে বিস্তারিত মুখ খোলেন বিচারপতি এস কে সিনহা। তিনি জানান, কানাডায় তাঁর স্ত্রীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি মিললেও এবং তাঁর নিজের পিআর আবেদন নীতিগতভাবে অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশ থেকে নেতিবাচক পুলিশ রিপোর্টের কারণে পিআর কার্ড ইস্যু স্থগিত রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে ফেরার আশায় টরন্টোতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল কার্যালয়ে বারবার যোগাযোগ ও ই-মেইল তাগাদা দিলেও এখন পর্যন্ত পাসপোর্ট সংক্রান্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম অমুসলিম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি শপথ নেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত থাকলেও মেয়াদের ৮২ দিন আগেই তৎকালীন সরকারের তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। মূলত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার প্রয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে বিচার বিভাগের নিজস্ব সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ন্যস্ত রেখে ঐতিহাসিক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ই সরকারের সঙ্গে তাঁর চূড়ান্ত বিরোধের সূত্রপাত ঘটায়। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই প্রধান বিচারপতি সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে সংসদীয় ক্ষমতা বাতিল করেন। রায়ে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সুশাসন নিয়ে বিচারপতির স্পষ্ট পর্যবেক্ষণে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং সংসদে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা হয়।
নিজের আত্মজীবনীমূলক বই ‘আ ব্রোকেন ড্রিম’-এর রেফারেন্স টেনে এস কে সিনহা জানান, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে রায় প্রকাশের আগের দিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উপস্থিতিতে সরকারের পক্ষে রায় দিতে তাঁর ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়। তিনি অনড় অবস্থানে অটল থাকায় পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে অবকাশকালীন ছুটির ঠিক আগে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাঁকে বাধ্যতামূলক চার মাসের ছুটিতে যেতে ভয়ভীতি দেখানো এবং বাসভবনে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখার অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি আপিল বিভাগের তাঁর সহকর্মী বিচারপতিদেরও একটি অংশের রহস্যজনক অসহযোগিতার মুখে অবশেষে বিচার বিভাগের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বলে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বিদেশ থেকেই ওই বছরের ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্র পাঠান এই প্রধান বিচারপতি।
দেশত্যাগের পর তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে একটি সাজানো মামলায় মোট ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারপতি সিনহার দাবি, উত্তরায় নিজের বৈধ বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাট কেনার স্বচ্ছ হিসাব তাঁর বার্ষিক আয়কর ফাইলে থাকা সত্ত্বেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, চাকরিজীবনের ল্যাম্পগ্রান্ট পেলেও এখনো তাঁর বৈধ পেনশন প্রক্রিয়া আটকে রাখা হয়েছে, কারণ সেখানে একজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার মাধ্যমে স্বাক্ষর যাচাই করার শর্ত দেওয়া হয়েছে—যা সাবেক প্রধান বিচারপতির পদমর্যাদার জন্য চূড়ান্ত অবমাননাকর। সবকিছু হারিয়ে এখন কেবল জন্মভূমিতে ফেরার একটি বৈধ পাসপোর্টের অপেক্ষায় প্রবাসে প্রহর গুনছেন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।