শিশুদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিলে দেশের ভিত্তি মজবুত হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
শিশুদের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা ও বহুমুখী গুণাবলি বিকাশের অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি আরও মজবুত ও টেকসই হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, একটি পরিবারের স্থায়িত্ব ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যেমন নির্ভর করে তার সন্তানদের সুষম ও নীতিবান মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার ওপর, ঠিক একইভাবে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামগ্রিক সমৃদ্ধিও নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিশুদের মেধা ও মননের সঠিক বিকাশের ওপর।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ ও ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের ৫০ বছর পূর্তি তথা সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই বর্ণাঢ্য আয়োজনটি সম্পূর্ণ শিশুদের। তাই বড়দের দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের চেয়ে শিশুদের মনের কথা শোনা এবং তাদের অভিব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়াই এমন আয়োজনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ সময় শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সূচনালগ্নে তিনিও একজন শিশু অতিথি হিসেবে এই প্রাঙ্গণে পদার্পণ করেছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৎকালীন সময়ে শিশু একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে তাঁর নিজের ও তাঁর প্রয়াত ছোট ভাইয়ের লেখা গল্প ও রচনা প্রকাশিত হয়েছিল, যা আজ প্রদর্শনী বোর্ডে নতুন করে দেখে তাঁর শৈশবের বহু মধুর স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।
শিশুদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, প্রতিটি শিশুর মাঝেই কোনো না কোনো বিশেষ মেধা ও দক্ষতা সুপ্ত থাকে। কেউ হয়তো ছবি আঁকায় পারদর্শী, কেউ আবৃত্তিতে, আবার কেউ গান, নৃত্য কিংবা নানা বাদ্যযন্ত্রে সহজাত অনুরাগ প্রকাশ করে। প্রয়োজন কেবল সেই প্রতিভাকে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কিংবা বিশুদ্ধ কোরআন তিলাওয়াত ও কিরাত—যেকোনো ইতিবাচক চর্চায় শিশুদের গভীর মনোযোগ দিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণরূপে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে সরকারের বিভিন্ন সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি দেশজুড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই ক্রীড়া ও শরীরচর্চাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে সমসংখ্যক ছাত্র ও ছাত্রী মিলিয়ে মোট ২২ লাখ ক্ষুদে শিক্ষার্থীকে জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তৃণমূল থেকেই আগামীতে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ অ্যাথলেট উঠে আসবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে প্রতিভা অন্বেষণের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ ‘নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রম এবং তৃণমূল থেকে শুরু করে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত বিস্তৃত ক্রীড়া উৎসবকে আরও সক্রিয় করার ঘোষণা দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, দেশের অধিকাংশ সাধারণ পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সন্তানদের অতিরিক্ত সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ বা ক্রীড়া সামগ্রীর ব্যবস্থা করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হয় না। তাই শহর কিংবা প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চল—সব প্রান্তের শিশুরাই যেন সমঅধিকারের ভিত্তিতে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও ক্রীড়া চর্চায় সমান সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যে বিদ্যালয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, এই মেগা উদ্যোগের প্রাথমিক রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল নাগাদ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পছন্দ অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্র, সংগীত ও ক্রীড়া প্রশিক্ষণের সুযোগ সরাসরি পাঠ্যক্রমের আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে।
ভবিষ্যতের বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে নতুন প্রজন্মকে এক ধাপ এগিয়ে রাখতে স্কুল পর্যায় থেকেই অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শিক্ষার নতুন উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, মাতৃভাষা বাংলা ও আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান এবং জাপানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ভাষাগুলোর মধ্য থেকে শিশুরা তাদের ভবিষ্যৎ চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো একটি ভাষা ঐচ্ছিক হিসেবে রপ্ত করার সুযোগ পাবে।
বক্তব্যের সমাপ্তিতে কোমলমতি শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় মেলবন্ধন গড়ে তোলার উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন, বাড়ি, বিদ্যালয় ও আশপাশের সবুজ বৃক্ষরাজির যত্ন নেওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ও নিরীহ পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণ করা প্রতিটি মানবিক মানুষের প্রধান দায়িত্ব। শৈশব থেকেই পরিবেশ ও প্রাণীর প্রতি এই মমত্ববোধ ও দায়িত্বশীলতাই আগামী দিনে একটি সংবেদনশীল, শান্তিময় ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।