বুধবার , ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমস্পেশালএক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়

এক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়

favicon
লেখক: নাবিল শাহরিয়ার রোহান
এক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়
লেখক: শিক্ষার্থী মো. নাবিল শাহরিয়ার রোহান,ইন্টারমিডিয়েট, ২য় বর্ষ,ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ,শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী।

সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত ব্রাশ করা, গোসল কিংবা রান্না-আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ধাপে পানির উপস্থিতি অবধারিত। কাজ শেষে অনায়াসে কল বন্ধ করে আমরা দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এই সহজলভ্যতা অনেক সময় আমাদের ভুলিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের কাছে এক ফোঁটা নিরাপদ পানি পাওয়া এখনো প্রতিদিনের এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম।


পানি ছাড়া জীবনের কোনো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। মানবজীবন, কৃষি, শিল্পোৎপাদন, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মূল ভিত্তি এই প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতার যেন শেষ নেই। দাঁত ব্রাশ করার সময় পানির কল অকারণে খুলে রাখা, দীর্ঘ সময় ধরে অপচয় করে গোসল করা কিংবা লিকেজ হওয়া পাইপ মাসের পর মাস অবহেলায় ফেলে রাখা-এসবকে আমরা খুবই সাধারণ বিষয় মনে করি। অথচ আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হওয়া এই ব্যক্তিগত অপচয়গুলো সম্মিলিতভাবে এক মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে।


জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এর তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মানুষ এখনো নিরাপদ ও সুব্যবস্থাপিত পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই সংকট কেবল তৃষ্ণার নয়, এটি মারাত্মক সামাজিক বৈষম্যেরও জন্ম দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পানি সংগ্রহের দায়িত্বের বড় অংশই বর্তায় নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর। বিশ্বের যে দেশগুলোতে এই তথ্য বিদ্যমান, সেখানে মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ কোটি ঘণ্টা ব্যয় করে কেবল ব্যবহার্য পানি সংগ্রহের পেছনে। এর ফলে অসংখ্য শিশুর শিক্ষার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে নারীর আত্মউন্নয়ন। আমাদের জন্য যা হাতের নাগালে থাকা একটি সাধারণ সুবিধা, প্রান্তিক জনপদে তা বেঁচে থাকার কঠোর লড়াই।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও স্বস্তিদায়ক নয়। ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মৌলিক পানির সুবিধা পেলেও সেই পানির মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা রয়ে গেছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, গৃহস্থালি পর্যায়ে সংগৃহীত পানির প্রায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ নমুনায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। অর্থাৎ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়া আর সেই পানি পানের উপযোগী হওয়া এক কথা নয়। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সংকট এখন চরমে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে সেখানে মিষ্টি পানির হাহাকার তীব্র হচ্ছে।


পানি সংকট মোকাবিলায় কেবল রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সুযোগ নেই। অপচয়ের একটি বড় কারণ আমাদের অসচেতন দৈনন্দিন অভ্যাস। একটি বাড়িতে অবহেলায় অপচয় হওয়া পানির পরিমাণ সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষ যখন একই ভুল করে, তখন তা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে বিপজ্জনকভাবে নামিয়ে দেয়। অপচয় রোধে সবসময় বড় কোনো প্রযুক্তি বা বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সদিচ্ছা ও ব্যক্তিগত সচেতনতা। ব্যবহারের পর কল শক্তভাবে বন্ধ করা, ক্ষতিকর লিকেজ দ্রুত মেরামত করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক ফোঁটা পানিও অপচয় না করার অভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।


পানি অপচয় না করার শিক্ষা কেবল পরিবেশ সচেতনতা নয়, এটি আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনও বটে। পবিত্র কোরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৭)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৩১)। অর্থাৎ, কোনো সম্পদ পর্যাপ্ত থাকলেই তা অপচয় করার অধিকার কারও নেই।


অনেকেই ভাবতে পারেন, একজন মানুষের সচেতনতায় বৈশ্বিক সংকট দূর হবে কীভাবে? বাস্তব সত্য হলো, যেকোনো বড় পরিবর্তনের শুরুটা হয় ক্ষুদ্র পদক্ষেপ দিয়ে। একজন ব্যক্তি সচেতন হলে তার প্রভাব পড়ে পরিবারে, আর সচেতন পরিবার থেকে গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল সমাজ। আজ আমরা যে পানিকে সহজলভ্য ভেবে অবহেলায় ড্রেনে ফেলে দিচ্ছি, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো তার চরম মূল্য চোকাতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে।


পানি সংরক্ষণ কেবল পরিবেশ বাঁচানোর কোনো মৌসুমি স্লোগান নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব, নৈতিক কর্তব্য এবং মানবতার দাবি। এক ফোঁটা পানি হয়তো একা পৃথিবী বদলাতে পারে না, তবে আমাদের সচেতনতায় সংরক্ষিত কোটি কোটি ফোঁটা পানি পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে অবশ্যই রক্ষা করতে পারে।


লেখক:

মো. নাবিল শাহরিয়ার রোহান

শিক্ষার্থী (দ্বাদশ শ্রেণি), ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ,

শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী। 

এক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 বুধবার , ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমস্পেশালএক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়

এক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়

favicon
লেখক: নাবিল শাহরিয়ার রোহান
এক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়
লেখক: শিক্ষার্থী মো. নাবিল শাহরিয়ার রোহান,ইন্টারমিডিয়েট, ২য় বর্ষ,ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ,শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী।

সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত ব্রাশ করা, গোসল কিংবা রান্না-আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ধাপে পানির উপস্থিতি অবধারিত। কাজ শেষে অনায়াসে কল বন্ধ করে আমরা দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এই সহজলভ্যতা অনেক সময় আমাদের ভুলিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের কাছে এক ফোঁটা নিরাপদ পানি পাওয়া এখনো প্রতিদিনের এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম।


পানি ছাড়া জীবনের কোনো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। মানবজীবন, কৃষি, শিল্পোৎপাদন, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মূল ভিত্তি এই প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতার যেন শেষ নেই। দাঁত ব্রাশ করার সময় পানির কল অকারণে খুলে রাখা, দীর্ঘ সময় ধরে অপচয় করে গোসল করা কিংবা লিকেজ হওয়া পাইপ মাসের পর মাস অবহেলায় ফেলে রাখা-এসবকে আমরা খুবই সাধারণ বিষয় মনে করি। অথচ আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হওয়া এই ব্যক্তিগত অপচয়গুলো সম্মিলিতভাবে এক মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে।


জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এর তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মানুষ এখনো নিরাপদ ও সুব্যবস্থাপিত পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই সংকট কেবল তৃষ্ণার নয়, এটি মারাত্মক সামাজিক বৈষম্যেরও জন্ম দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পানি সংগ্রহের দায়িত্বের বড় অংশই বর্তায় নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর। বিশ্বের যে দেশগুলোতে এই তথ্য বিদ্যমান, সেখানে মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ কোটি ঘণ্টা ব্যয় করে কেবল ব্যবহার্য পানি সংগ্রহের পেছনে। এর ফলে অসংখ্য শিশুর শিক্ষার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে নারীর আত্মউন্নয়ন। আমাদের জন্য যা হাতের নাগালে থাকা একটি সাধারণ সুবিধা, প্রান্তিক জনপদে তা বেঁচে থাকার কঠোর লড়াই।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও স্বস্তিদায়ক নয়। ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মৌলিক পানির সুবিধা পেলেও সেই পানির মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা রয়ে গেছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, গৃহস্থালি পর্যায়ে সংগৃহীত পানির প্রায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ নমুনায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। অর্থাৎ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়া আর সেই পানি পানের উপযোগী হওয়া এক কথা নয়। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সংকট এখন চরমে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে সেখানে মিষ্টি পানির হাহাকার তীব্র হচ্ছে।


পানি সংকট মোকাবিলায় কেবল রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সুযোগ নেই। অপচয়ের একটি বড় কারণ আমাদের অসচেতন দৈনন্দিন অভ্যাস। একটি বাড়িতে অবহেলায় অপচয় হওয়া পানির পরিমাণ সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষ যখন একই ভুল করে, তখন তা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে বিপজ্জনকভাবে নামিয়ে দেয়। অপচয় রোধে সবসময় বড় কোনো প্রযুক্তি বা বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সদিচ্ছা ও ব্যক্তিগত সচেতনতা। ব্যবহারের পর কল শক্তভাবে বন্ধ করা, ক্ষতিকর লিকেজ দ্রুত মেরামত করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক ফোঁটা পানিও অপচয় না করার অভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।


পানি অপচয় না করার শিক্ষা কেবল পরিবেশ সচেতনতা নয়, এটি আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনও বটে। পবিত্র কোরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৭)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৩১)। অর্থাৎ, কোনো সম্পদ পর্যাপ্ত থাকলেই তা অপচয় করার অধিকার কারও নেই।


অনেকেই ভাবতে পারেন, একজন মানুষের সচেতনতায় বৈশ্বিক সংকট দূর হবে কীভাবে? বাস্তব সত্য হলো, যেকোনো বড় পরিবর্তনের শুরুটা হয় ক্ষুদ্র পদক্ষেপ দিয়ে। একজন ব্যক্তি সচেতন হলে তার প্রভাব পড়ে পরিবারে, আর সচেতন পরিবার থেকে গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল সমাজ। আজ আমরা যে পানিকে সহজলভ্য ভেবে অবহেলায় ড্রেনে ফেলে দিচ্ছি, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো তার চরম মূল্য চোকাতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে।


পানি সংরক্ষণ কেবল পরিবেশ বাঁচানোর কোনো মৌসুমি স্লোগান নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব, নৈতিক কর্তব্য এবং মানবতার দাবি। এক ফোঁটা পানি হয়তো একা পৃথিবী বদলাতে পারে না, তবে আমাদের সচেতনতায় সংরক্ষিত কোটি কোটি ফোঁটা পানি পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে অবশ্যই রক্ষা করতে পারে।


লেখক:

মো. নাবিল শাহরিয়ার রোহান

শিক্ষার্থী (দ্বাদশ শ্রেণি), ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ,

শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী। 

এক ফোঁটা পানির মূল্য ও আমাদের নাগরিক দায়
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬