মঙ্গলবার , ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমরাজশাহীরাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ
প্রাথমিকেই থামছে চরের মেয়েদের স্বপ্ন

রাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ

favicon
কানিজ ফাতেমা রোজা :
রাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ

স্থানীয় সরকার কাঠামোর দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব শূন্যতা, ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের ঘাটতি এবং উন্নয়ন সহযোগী বেসরকারি সংস্থাগুলোর তহবিল কমে যাওয়ার প্রভাবে রাজশাহীতে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে নামমাত্র কমিটি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সমন্বিত ও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় জেলাজুড়ে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ের হার উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পারিবারিক জীবনে, যার ফলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাজশাহী অঞ্চলে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে শতকরা ৬৫ দশমিক ৭ ভাগ অপ্রাপ্তবয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্যে শতকরা ৭ দশমিক ১২ ভাগের বয়স মাত্র ১০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ব্যুরোর ২০২৫ সালের জরিপ পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রায় ৬৭ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব শহরে শতকরা ৫০ ভাগ এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৫৬ ভাগ। এছাড়া ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ের শিকার হচ্ছে অন্তত ১৩ শতাংশ কন্যাশিশু। সংশ্লিষ্ট আইনি বিশ্লেষকদের মতে, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের কারণে শারীরিক ও মানসিক জটিলতার পাশাপাশি দ্রুত সংসার ভেঙে যাওয়া এবং ডিভোর্সের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে রাজশাহীর দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে পবার চর মাঝারদিয়া ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে একটিমাত্র মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। প্রাথমিকে মেধার স্বাক্ষর রাখা অনেক কন্যাশিশু উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী থাকলেও যোগাযোগের দুর্গমতা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবকে অজুহাত দেখিয়ে অভিভাবকরা দ্রুত বিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করছেন। ফলে প্রাথমিকেই ইতি ঘটছে তাদের শিক্ষাজীবন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। প্রশাসনিক দফতরগুলোতে নানা সভা-সেমিনার ও দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকলেও চরাঞ্চলের মতো স্পর্শকাতর জনপদে দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক তৎপরতা প্রায় নেই বললেই চলে।

মাঠপর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা স্বীকার করছেন যে, প্রকল্প ও প্রচারণার নির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় তারা তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক কিংবা সামাজিক সমাবেশ নিয়মিত চালিয়ে নিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক নির্দেশে তাৎক্ষণিক কিছু বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হলেও তা স্থায়ী সমাধানে কাজে আসছে না। অন্যদিকে আগে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইনি সহায়তা, বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও সচেতনতা নিয়ে কাজ করলেও আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের তহবিল সংকুচিত হওয়ায় অধিকাংশ সংস্থাই এ কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে যে অল্পসংখ্যক ক্লাব বা প্রোগ্রাম চালু রয়েছে, তা এই গভীর সংকট মোকাবিলায় কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারছে না। স্থানীয় উন্নয়ন বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, কেবল কঠোর আইন কিংবা আনুষ্ঠানিক কমিটি দিয়ে বাল্যবিয়ে নির্মূল করা অসম্ভব, যতক্ষণ না পর্যন্ত সামাজিক আন্দোলন জোরদার এবং তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় জনমনে স্থায়ী সচেতনতা তৈরি করা যায়।

রাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ
প্রাথমিকেই থামছে চরের মেয়েদের স্বপ্ন
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 মঙ্গলবার , ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমরাজশাহীরাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ
প্রাথমিকেই থামছে চরের মেয়েদের স্বপ্ন

রাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ

favicon
কানিজ ফাতেমা রোজা :
রাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ

স্থানীয় সরকার কাঠামোর দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব শূন্যতা, ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের ঘাটতি এবং উন্নয়ন সহযোগী বেসরকারি সংস্থাগুলোর তহবিল কমে যাওয়ার প্রভাবে রাজশাহীতে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে নামমাত্র কমিটি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সমন্বিত ও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় জেলাজুড়ে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ের হার উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পারিবারিক জীবনে, যার ফলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাজশাহী অঞ্চলে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে শতকরা ৬৫ দশমিক ৭ ভাগ অপ্রাপ্তবয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্যে শতকরা ৭ দশমিক ১২ ভাগের বয়স মাত্র ১০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ব্যুরোর ২০২৫ সালের জরিপ পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রায় ৬৭ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব শহরে শতকরা ৫০ ভাগ এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৫৬ ভাগ। এছাড়া ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ের শিকার হচ্ছে অন্তত ১৩ শতাংশ কন্যাশিশু। সংশ্লিষ্ট আইনি বিশ্লেষকদের মতে, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের কারণে শারীরিক ও মানসিক জটিলতার পাশাপাশি দ্রুত সংসার ভেঙে যাওয়া এবং ডিভোর্সের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে রাজশাহীর দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে পবার চর মাঝারদিয়া ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে একটিমাত্র মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। প্রাথমিকে মেধার স্বাক্ষর রাখা অনেক কন্যাশিশু উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী থাকলেও যোগাযোগের দুর্গমতা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবকে অজুহাত দেখিয়ে অভিভাবকরা দ্রুত বিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করছেন। ফলে প্রাথমিকেই ইতি ঘটছে তাদের শিক্ষাজীবন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। প্রশাসনিক দফতরগুলোতে নানা সভা-সেমিনার ও দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকলেও চরাঞ্চলের মতো স্পর্শকাতর জনপদে দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক তৎপরতা প্রায় নেই বললেই চলে।

মাঠপর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা স্বীকার করছেন যে, প্রকল্প ও প্রচারণার নির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় তারা তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক কিংবা সামাজিক সমাবেশ নিয়মিত চালিয়ে নিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক নির্দেশে তাৎক্ষণিক কিছু বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হলেও তা স্থায়ী সমাধানে কাজে আসছে না। অন্যদিকে আগে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইনি সহায়তা, বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও সচেতনতা নিয়ে কাজ করলেও আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের তহবিল সংকুচিত হওয়ায় অধিকাংশ সংস্থাই এ কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে যে অল্পসংখ্যক ক্লাব বা প্রোগ্রাম চালু রয়েছে, তা এই গভীর সংকট মোকাবিলায় কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারছে না। স্থানীয় উন্নয়ন বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, কেবল কঠোর আইন কিংবা আনুষ্ঠানিক কমিটি দিয়ে বাল্যবিয়ে নির্মূল করা অসম্ভব, যতক্ষণ না পর্যন্ত সামাজিক আন্দোলন জোরদার এবং তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় জনমনে স্থায়ী সচেতনতা তৈরি করা যায়।

রাজশাহীতে বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ে ও বিচ্ছেদ
প্রাথমিকেই থামছে চরের মেয়েদের স্বপ্ন
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬