বিগত সরকারের দেয়া রাজনৈতিক ২৭ হাজার মামলার বোঝা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলার বোঝা এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) লাখ লাখ নেতাকর্মীকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো প্রায় ২৭ হাজার মামলা আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে ঝুলে রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ২২ লাখ দলীয় নেতাকর্মী এখনো কাগজে-কলমে আসামি হিসেবে রয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে দায়ের থাকা এসব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে তদ্বির ও খোঁজখবর নিচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, স্বৈরাচারী শাসন অবসানের পরও বিগত আমলের রাজনৈতিক মামলার বোঝা বয়ে বেড়ানো চরম হতাশা ও উদ্বেগের।
বিএনপির মামলা ও তথ্য সংরক্ষণ সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় দলটির প্রায় ৬৫ লাখ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন পর্যায়ে আসামি করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক মামলা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো ২৭ হাজার মামলার আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে সরকার পতনের পরও তৃণমূলের বহু নেতাকর্মীকে জামিন বহাল রাখা ও নিয়মিত হাজিরাসহ নানা আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
দলটির নীতিনির্ধারকদের অভিযোগ, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তালিকা প্রস্তুত করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হলেও তা কার্যকরে দায়িত্বশীল মহলে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূলের ভুক্তভোগীরা জেলা প্রশাসকদের কাছে আবেদন জমা দিলেও সেখানে নিষ্পত্তির কাজ কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। জেলা কমিটির সক্রিয়তার অভাবে অনেক স্থানে নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ দলীয় দপ্তরের।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দলকে দমন করতে উন্মত্তের মতো মামলা দায়ের করেছিল। জীবদ্দশায় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি, এমনকি হজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে অবস্থানরত ব্যক্তি কিংবা মৃত ব্যক্তির নামেও গায়েবি মামলা দেওয়ার নজির স্থাপন করেছিল বিগত সরকার। তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে দল ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে বহু মামলা প্রত্যাহার হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলোও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য দলীয়ভাবে জোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির প্রায় সব শীর্ষ নেতার নামেই শত শত মামলা দেওয়া হয়েছিল। হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামে সাড়ে চার শ, এস এম জাহাঙ্গীরের সাড়ে তিন শ, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর সোয়া তিন শ এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও মীর সরফত আলী সপুর নামে আড়াই শ করে মামলা ঝুলছিল। এছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, শিমুল বিশ্বাস, রফিকুল আলম মজনু, মামুন হাসানসহ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নেতাই এসব মামলার আওতায় দীর্ঘ সময় জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। এমনকি দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকেও বহু মামলার আসামি করে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বিগত সরকারের আমলে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়ের হওয়া রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি এবং জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে জেলাভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সংসদ অধিবেশনে আইন মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় যে, ইতিমধ্যে ২৩ হাজার ৮৬৫টি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় এখনো লাখ লাখ কর্মীকে মানসিক ও আর্থিকভাবে মামলার বোঝা টানতে হচ্ছে। অবিলম্বে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সব মিথ্যা মামলা একযোগে বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।