চারঘাটে পদ্মার ভাঙন রোধে ৪ কোটির জিও ব্যাগ প্রকল্পে হরিলুট
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় প্রমত্তা পদ্মার তীব্র ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় চার কোটি টাকার জরুরি প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো মানুষের দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তির বদলে প্রকল্পটি এখন স্থানীয়দের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীতে ফেলা জিও ব্যাগ কেটে বালু বের করে খালি বস্তা তুলে এনে বিক্রি, সেই পুরোনো বস্তায় পুনরায় মাটিমিশ্রিত বালু ভরে নদীতে ফেলা এবং নির্ধারিত ওজনের চেয়ে কম বালু দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে ৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করেছে।
সরেজমিন ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই চারঘাটের গোপালপুর, চন্দনশহর, পিরোজপুর ও সাহাপুর এলাকায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। চোখের পলকে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি ও শত শত পরিবারের বসতভিটা। সবচেয়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে পিরোজপুর এলাকার বহু বসতবাড়ি, একটি জামে মসজিদ এবং পিরোজপুর-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. নূর উদ্দিন শেখ জানান, নদী এখন স্কুল থেকে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিটার দূরে অবস্থান করছে; জরুরি কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যাবে।
ভাঙন প্রতিরোধে পাউবো প্রথম ধাপে বিশেষ তহবিল থেকে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ হাজার ২০০টি ব্যাগ ডাম্পিং করে। পরবর্তীতে কাজের পরিধি বাড়িয়ে পিরোজপুরে ১০টি প্যাকেজে প্রায় ৩ কোটি ব্যয়ে ৪৫ হাজার এবং সাহাপুরে ৩টি প্যাকেজে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার ৫০০ ব্যাগসহ মোট প্রায় ৪ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন এলাকাতেও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞেই দেখা দিয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নতুন প্রতিটি জিও ব্যাগের বাজারমূল্য প্রায় ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। নদীতে ডাম্পিং করার পর একটি অসাধু সিন্ডিকেট নদী থেকে ব্যাগগুলো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে বালু বের করে খালি বস্তা ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় ঠিকাদারের প্রতিনিধিদের কাছে পুনরায় বিক্রি করছে। ঠিকাদারের লোকজন সেই ব্যবহৃত ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তায় আবার বালু ভরে নদীতে ফেলছে। এছাড়া প্রতিটি ব্যাগে ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি মোটা বালু থাকার নিয়ম থাকলেও চর থেকে আনা নিম্নমানের মাটিযুক্ত বালু দিয়ে কম ওজনে ব্যাগ প্রস্তুত করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মেজবাহ্-উল-ইসলাম চৌধুরী অভিযান পরিচালনা করে ৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করেন এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও পাউবোকে লিখিতভাবে অবহিত করেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাজা তারেক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান দাবি করেন, কারিগরি মান ও পরিমাপ বজায় রেখেই কাজ করা হচ্ছে এবং কোনো পুরোনো বস্তা ব্যবহার করা হয়নি।
পাউবোর চারঘাটের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবু রৌশন মাস্উদ জানান, জিও ব্যাগ ডাম্পিং কেবল একটি তাৎক্ষণিক ও সাময়িক পদক্ষেপ। কিছু ব্যক্তি অনৈতিকভাবে বস্তা কাটার চেষ্টা করায় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা স্থায়ী প্রতিরক্ষার আওতায় আনার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন রয়েছে।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ৩৫০টি ব্যবহৃত ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসককে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কাজের মান নিশ্চিতে কঠোর নজরদারি চলছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা এলেই জরুরি বরাদ্দের নামে কোটি কোটি টাকা নদীতে না ঢেলে শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী ব্লক বাঁধ ও টেকসই নদীশাসনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।