আদালতে এআই দিয়ে মামলার রায় লেখা বেআইনি না হলেও অনৈতিক: প্রধান বিচারপতি
আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) ব্যবহার করে মামলার রায় লেখা প্রচলিত আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বেআইনি না হলেও তা স্পষ্টতই অনুচিত ও অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ মিলনায়তনে দেশের প্রথম ‘এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
নিজের দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতার আলোকে প্রধান বিচারপতি বলেন, “এআই দিয়ে নানাবিধ কাজ করা গেলেও মামলার রায় লেখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি হয়তো সরাসরি বেআইনি নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই যথাযথ নয় এবং অনৈতিক।” এর ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেন, একটি কার্যকর ও ন্যায়সংগত রায় লিখতে প্রধানত তিনটি উপাদানের সমন্বয় প্রয়োজন-ঘটনার বাস্তবতা (ফ্যাক্ট), প্রযোজ্য আইন এবং বিচারকের নিজস্ব বিবেক ও নৈতিকতা। এই বিবেক কিংবা মানবিক বিচারবোধ কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি মানুষের একান্ত নিজস্ব চিন্তাশক্তি; মানুষ যদি সেই মৌলিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তবে সে নিজে থেকেই পিছিয়ে পড়বে।
বিচার কাজে এআই-এর অবাধ ব্যবহারের ঝুঁকি তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বিদেশে ঘটে যাওয়া একটি মামলার উদাহরণ দেন। সেখানে এআই-এর মাধ্যমে উপস্থাপিত একটি ভুয়া কেস রেফারেন্সের ওপর ভিত্তি করে রায় ঘোষণা করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে একাধিক আদালত তা অনুসরণ করে। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাস্তবে সেই মামলার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, এআই থেকে পাওয়া তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই না করে ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিচারকাজে এআই ঠিক কতটুকু ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা ও নীতিমালা থাকা আবশ্যক।
প্রযুক্তির ইতিবাচক দিককে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তবে কোনো অবস্থাতেই মানুষের সংবিধানস্বীকৃত অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। রাষ্ট্র, সংবিধান ও আইন সবই মানুষের কল্যাণের জন্য উল্লেখ করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাঁচার অধিকার, কাজের অধিকার ও সম্পত্তির অধিকারের মতো সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারগুলো যেন এআই ব্যবহারের কারণে কোনোভাবে খর্ব না হয়। যদি প্রযুক্তির প্রয়োগে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তবে তা অসাংবিধানিক হয়ে পড়বে। তাই এআই নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব ও ঝুঁকি সম্পর্কেও সর্বদা সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধান বিচারপতি।