শীতের রাতে রাজশাহী কাঁপে, কাঁপে মানুষের জীবন
রাজশাহীর শীত নেমে আসে শব্দহীন। সন্ধ্যার পর শহরের আলো ঝাপসা হয়ে যায়, কুয়াশা ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলে রাস্তা, দোকান, মানুষ। দিনের ব্যস্ততা গুটিয়ে গেলে শুরু হয় অন্য এক সময়—যেখানে শীত শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, বেঁচে থাকার সঙ্গে লড়াই।
ভোরের আগে একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দিনমজুর জলিল। কুয়াশার মধ্যে তাকে প্রথমে মানুষ নয়, ছায়া মনে হয়। হাত দুটো বুকের কাছে জড়ানো, শরীরটা সামান্য কাঁপছে। তিনি বলেন, “শীতের সময় কাজ কমে যায়। কিন্তু দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই। যদি কেউ ডাকে।” তার কণ্ঠে আশা নেই, তবু দাঁড়িয়ে থাকার এক অদ্ভুত জেদ আছে—কারণ না দাঁড়ালে দিনটাই অন্ধকার।
রেললাইনের ধারে পুরোনো কার্টনের ওপর বসে আছেন রাবেয়া খাতুন। মাথার ওপর খোলা আকাশ, গায়ে পাতলা শাল। রাত নামলেই শীত যেন শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তিনি বলেন, “রাতে মনে হয় হাড়গুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করলেই ভয় লাগে—এই বুঝি আর ভোর দেখব না।” কথাগুলো বলতে বলতে তিনি আকাশের দিকে তাকান, যেন সেখানে কোনো উত্তর লুকানো আছে।
আবহাওয়া অফিস বলছে, তাপমাত্রা খুব নিচে নামেনি। কাগজে-কলমে শীত মাঝারি। কিন্তু এই শীত কাগজের নয়। বাতাসে ভেজা ঠান্ডা, ঘন কুয়াশা আর সূর্যের অনুপস্থিতি মিলে শীতকে ভারী করে তুলেছে। এই ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে যাদের জীবনে কোনো ছাদ নেই।
রাতে শহরের কিছু জায়গায় আগুন জ্বলে। সেই আগুন ঘিরে বসে কয়েকজন মানুষ। আগুনের আলোয় তাদের মুখগুলো স্পষ্ট হয়—ক্লান্ত, নীরব, বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বুড়ো। আগুন নিভে গেলে আবার অন্ধকার, আবার শীত, আবার কাঁপুনি।
রিকশাচালক মতিউর বলেন, “সারা দিন চালাই, শরীর ভেঙে যায়। রাতে বাচ্চাদের দিকে তাকাই—ওদের গায়ে কিছু নেই। নিজের শীতটা ভুলে যাই, কিন্তু ওদেরটা ভুলতে পারি না।” তার চোখে জল নেই, কিন্তু কথার ফাঁকে জমে থাকে চাপা কষ্ট।
শহরের মার্কেটগুলোতে গরম কাপড় ঝুলছে। আলো ঝলমলে দোকানে মানুষ ঢুকছে, বের হচ্ছে। কিন্তু ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই শুধু তাকিয়ে দেখে। একবার কাপড়ে হাত বুলিয়ে আবার পকেটে হাত ঢোকায়—সেখানে কিছু নেই।
এই শীতে রাজশাহী শহর দু’ভাগে বিভক্ত। একপাশে ঘরের ভেতর দরজা বন্ধ করে রাখা উষ্ণতা, আর অন্যপাশে খোলা আকাশের নিচে ঠান্ডার সঙ্গে প্রতিদিনের বোঝাপড়া। শীত এখানে শুধু ঋতু নয়—এখানে শীত মানে ধৈর্যের পরীক্ষা, সহ্য করার গল্প।
কুয়াশার ভেতর দিয়ে যখন ভোর আসে, তখন এই মানুষগুলো আবার উঠে দাঁড়ায়। কারণ জীবন থামে না। শীতও না। থামে শুধু আমাদের দেখার অভ্যাস—যদি আমরা থামি, তবে হয়তো এই শীত একটু কম লাগত।