রাজশাহীর হরিয়ানে চলন্ত ট্রেন থেকে তেল চুরির মহোৎসব
রাজশাহীর হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে চলন্ত ট্রেনের ওয়াগন থেকে তেল চুরির একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ঈশ্বরদীর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ‘ঢাকা মেল ৬ ডাউন’ ট্রেনের পেছনের ওয়াগন থেকে প্রকাশ্যে তেল লুটের এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। প্রাথমিক তদন্তে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সাতজন জড়িতকে শনাক্ত করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আন্তনগর ঢাকাগামী ট্রেনের পাওয়ারকারে তেল সরবরাহের জন্য দুটি বিশেষ ওয়াগন আনা হয়েছিল। তেল সরবরাহ শেষে ওয়াগন দুটি ‘ঢাকা মেল ৬ ডাউন’ ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত করে ঈশ্বরদী পাঠানো হচ্ছিল। ট্রেনটি লোকাল হওয়ায় হরিয়ান স্টেশনে নির্ধারিত মাত্র তিন মিনিটের যাত্রাবিরতি দেয়। আর এই স্বল্প সময়ের বিরতিকেই সুযোগ হিসেবে নেয় স্থানীয় একটি চক্র। ট্রেনটি চলা শুরু করার ঠিক আগমুহূর্তে এবং চলাকালীন সময়ে সুকৌশলে ওয়াগনের ভেতর থেকে তেল চুরি করা হয়। তবে ঠিক কী পরিমাণ জ্বালানি তেল লোপাট হয়েছে, তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি রেল কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপে তেল চুরির ভয়াবহ ও ধৃষ্টতাপূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, হরিয়ানের রূপসী ডাঙ্গা এলাকার রিপন, সাজিপাড়ার নাহিদ, হরিয়ান বাজারের আলামিন, এবং রেলওয়ে স্টেশন এলাকার কিরন, রক্সি ও মিলনসহ বেশ কয়েকজন এই কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন। ভিডিওর দৃশ্য অনুযায়ী, মাস্ক পরা ওয়েম্যান কিরন আলী ওয়াগন থেকে একটি সাদা বস্তা নিচে নামিয়ে দেন, যা নিচে থাকা সহযোগীরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। পরবর্তীতে ওয়াগনের ভেতর থেকে ছোট বালতি ও জারকি ভরতি তেল নিচে নামানো হয়। ট্রেন গতি বাড়ালে কয়েকজন দ্রুত নেমে গেলেও কিরনকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওয়াগনের ওপরে দেখা যায়। একপর্যায়ে নীল রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক চলন্ত ট্রেনের পেছনে দৌড়ে আসেন এবং ওয়াগন থেকে নামিয়ে দেওয়া তেলভর্তি জারকিন লুফে নেন। সবশেষে কিরন নিজেও একটি জগে তেল নিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েন।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, হরিয়ান স্টেশন এলাকায় তেল চুরির ঘটনা নতুন কিছু নয়। রাতের আধারে নিয়মিত এসব অপকর্ম চললেও মাঝেমধ্যে দিনের আলোতেও এই বেপরোয়া চুরি সংঘটিত হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত ওয়েম্যান কিরন আলী মূলত নেসকোর কাটাখালী বিদ্যুৎ স্টেশন সাইডিং লাইনের টিএলআর ওয়েম্যান হিসেবে কর্মরত। নেসকোর লাইনে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও মেট কামরুল ইসলামের অননুমোদিত হস্তক্ষেপে তাকে মূল লাইনে কাজ করানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। মেটের সঙ্গে এই বিশেষ সক্ষতার সুযোগ নিয়েই কিরন বিভিন্ন সময় এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওয়েম্যান কিরন আলী দাবি করেন, তেল চুরির সঙ্গে তিনি নন, বরং তার ছোট ভাই নয়ন ও অন্যান্যরা জড়িত ছিলেন। যদিও ঘটনার সময় নয়ন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। মেট কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান, ট্রেন আসার পর পানি খাওয়ার জন্য আধা ঘণ্টার একটি বিরতি থাকে এবং ওই সময়ে কর্মীরা নিজেদের মতো সময় কাটান; কিরন অনুমতি ছাড়া কোথায় গেছেন সে বিষয়ে তার কোনো তথ্য নেই।
হরিয়ান স্টেশন মাস্টার আরিফ হোসেন জানান, ঘটনার সময় পাবনা থেকে ঢালারচর এক্সপ্রেস ট্রেন আসছিল এবং উচ্চপদস্থ রেলওয়ে কর্মকর্তারা ওই ট্রেনে থাকায় ট্রেন ক্রসিং সামলাতে তিনি চরম ব্যস্ত ছিলেন। ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ চিৎকার শুনতে বাইরে এসে তিনি কয়েকজনকে দৌড়াতে দেখেন। পরে কন্ট্রোল রুম থেকে তাকে ওয়াগন থেকে কিছু নামিয়ে নেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ওয়াগনের সার্বিক নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও জিআরপি পুলিশের।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আরএনবি চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি জানার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠিয়েছিলাম। তবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেছি এবং জড়িতদের স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পিডব্লিউ মো. বাকিতুল্লাহ জানান যে বিষয়টি সম্পর্কে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবগত ছিলেন না, তবে দ্রুত খোঁজ নিয়ে ঘটনার সত্যতা সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।