নারী-বান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
গণপরিবহনে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ, সহায়ক এবং জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে রাজশাহী নগরীর অলোকার মোড় এলাকার মাস্টার শেফ রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্যোগে আয়োজিত এক সমন্বয় সভায় বক্তারা এ আহ্বান জানান।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী, হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন এবং ব্র্যাকের জেলা সমন্বয়ক মো. মহসিন আলী। এছাড়াও সভায় পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা বলেন, গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি নারী-বান্ধব ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যবস্থাপক মো. মাইনুল হোসেন সভায় কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন, নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সময়ের দাবি অনুযায়ী জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের লিডার নাজমুল হক। তিনি বলেন, গণপরিবহনে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিকার এবং নিয়মিত মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নারী যাত্রীরা যাতে হয়রানির শিকার হলে সহজেই অভিযোগ জানাতে পারেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, সে ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনায় সড়ক নিরাপত্তা ও যৌন হয়রানি বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং জাতীয় হেল্পলাইন সেবার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে গণপরিবহনে নারীরা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন রূপ এবং জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করার উপায় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় জানানো হয়, ব্র্যাকের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘শিখা’ প্রকল্পটি ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৯ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র, পাবলিক স্পেস এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ, সহনশীল ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার মোসা. আরজিনা খাতুন, বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মাসুমা মুস্তারী, জেলা তথ্য অফিসের উপপরিচালক নাফেয়ালা নাসরিন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ বনি আহসান, সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল, জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল রাজশাহীর মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আরিফুল ইসলাম আরিফ এবং নিরাপদ সড়ক চাই রাজশাহী জেলা শাখার সহ-সভাপতি ওয়ালিউর রহমান বাবুসহ অন্যান্য অংশগ্রহণকারী।
বক্তারা বলেন, পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশ, পরিবহন সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভা শেষে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এতে গণপরিবহনে নারীবান্ধব সহায়তা ডেস্ক স্থাপন, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা, জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।