সাইবার হামলার ঝুঁকিতে ইন্টারনেটের ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি মারাত্মক নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্তের পর বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের সাইবার বিপর্যয়ের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লুকিয়ে থাকা এসব দুর্বলতা উন্মোচিত হওয়ার পরপরই সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের বহু গুরুত্বপূর্ণ পোর্টাল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা প্যাচ উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুর্বল সার্ভারগুলো লক্ষ্য করে হ্যাকারদের তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ক্যালিফ ও উইজের গবেষকরা উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে পিএইচপির এই গভীর ত্রুটি শনাক্ত করেন, যা মানুষের পক্ষে ম্যানুয়ালি খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ওপেনএআই এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় নিরাপত্তা সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) জরুরি সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে কোনো ধরনের অনুমোদন বা লগইন ছাড়াই দূরবর্তী অবস্থান থেকে হ্যাকাররা সার্ভারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ডেটাবেজে অবৈধ প্রবেশাধিকার নিতে সক্ষম। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলেছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করতে না পারলে ঝুঁকি এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় সরকারি পোর্টাল ওভারহেইড.এনএল, গুরুত্বপূর্ণ রটারডাম বন্দর, দেশটির ফুটবল সংস্থা কেএনভিবি এবং একাধিক হাসপাতালের ওয়েবসাইট অফলাইনে রাখা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের সরকারি আইটি সেবাদাতা সংস্থা ভালতোরি তাদের নেটওয়ার্কের ওয়েব সেবা স্থগিত করেছে এবং ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসনের সাইটগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছে। ডেনমার্কের শিক্ষা যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কমবিট তাদের সেবা বন্ধ করেছে এবং মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া ও যুক্তরাজ্যের এডিনবরা কাউন্সিলসহ বেশ কয়েকটি শীর্ষ প্ল্যাটফর্মে সাময়িক বিভ্রাট লক্ষ্য করা গেছে।
ওয়েব প্রযুক্তি পর্যবেক্ষক সংস্থা ডব্লিউথ্রিটেকসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইন্টারনেটে ব্যবহৃত শনাক্তযোগ্য ওয়েবসাইটের প্রায় ৭৫ শতাংশই তৈরি হয়েছে পিএইচপির ওপর ভিত্তি করে। বিশ্বের ৪৩ শতাংশের বেশি ওয়েবসাইট চালিত হয় ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে, যা সম্পূর্ণ পিএইচপিনির্ভর। এ ছাড়া জুমলা, দ্রুপাল ও ম্যাজেন্টার মতো জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমও এই ভাষায় তৈরি। ফলে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েব অবকাঠামো এই দুর্বলতার কারণে প্রত্যক্ষ সাইবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোস ও ক্লাউডফেয়ার সতর্ক করে জানিয়েছে, সাইবার হামলাকারীরা ইন্টারনেটের প্রতিটি দুর্বল সার্ভার চিহ্নিত করতে স্বয়ংক্রিয় বট ও এআই স্ক্রিপ্ট নামিয়েছে। ক্লাউডফেয়ারের সিটিও ডেন কেইনেখট জানান, নিরাপত্তাত্রুটি কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের বড় আক্রমণ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, যার কারণে ফায়ারওয়াল সুরক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হচ্ছে। পিএইচপি ফাউন্ডেশন দ্রুত নতুন সংস্করণের সিকিউরিটি প্যাচ উন্মুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, পিএইচপি ৮.১ বা তার আগের সংস্করণ ব্যবহারকারীদের অনতিবিলম্বে নতুন সংস্করণে রূপান্তর হতে হবে এবং আপডেটের পাশাপাশি পূর্বে সার্ভারে কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।