কণ্ঠ নকল ও ছবি সুপার ইম্পোজ করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এআই, সতর্ক করলেন আইনমন্ত্রী
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি নিষিদ্ধ না করে এর বহুমুখী অপব্যবহার রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বুধবার রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল-২০২৬’-এর সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। সোসাইটি ফর জাস্টিস অ্যান্ড এআই (এসজেএআই), লিগ্যালাইজড এডুকেশন বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের যৌথ উদ্যোগে পাঁচ দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক মানের কোর্সের আয়োজন করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। তবে প্রযুক্তির এই সুবিশাল প্রসারের সঙ্গে যে ঝুঁকি ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ যুক্ত রয়েছে, সেটির উপযুক্ত রেগুলেটরি স্কিম বা কার্যকর আইনি কাঠামো আমরা এখনো পুরোপুরি প্রণয়ন করতে পারিনি। আগামী দিনে এআই যেভাবে ব্যক্তিজীবন ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়কে প্রভাবিত করবে, তা ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি সমাজে বিভ্রান্তি তৈরির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান যুগে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে যে কারও কণ্ঠস্বর নকল করা হচ্ছে এবং ছবি বিকৃত বা সুপার ইম্পোজ করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হানা হচ্ছে। এভাবে মানুষের চিন্তা ও মানসিক প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
আইনমন্ত্রী বিশেষভাবে বিচার বিভাগের ঝুঁকির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এআইয়ের অপপ্রয়োগের ফলে সবচেয়ে জটিল ও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে আদালত ও বিচার ব্যবস্থা। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ এমনিতেই নানা প্রতিকূলতায় পূর্ণ, তার ওপর এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য উপস্থাপন করা হলে সাধারণ প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি বিচারহীনতার ঝুঁকিতে পড়বে। একইসঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও এর মাধ্যমে প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, রায় নিজের পক্ষে না গেলে বিচারকদের সামাজিকভাবে হেয় বা অপদস্ত করার অপচেষ্টায় এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার হতে পারে। এ কারণে বিচারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এআই সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হতে হবে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে আইনমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী এবং এটিকে নিষিদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই; বরং এর অপব্যবহার বন্ধে একটি স্বচ্ছ আইনি সুরক্ষা বলয় নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। সরকার জনগণের ওপর কোনো একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না, বরং যৌক্তিক বিতর্ক ও সর্বজনীন মতামতের আলোকেই নীতি প্রণয়ন করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাসনুভা শেলী।
পাঁচ দিনের এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মশালায় দেশের বিচার বিভাগ, মানবাধিকার সুরক্ষা, আর্থিক খাত, স্বাস্থ্যসেবা ও জনপ্রশাসনে এআই গভর্নেন্সের বাস্তবায়ন ও নৈতিক ব্যবহারের ওপর বিশদ আলোচনা করা হয়। সমাপনী অধিবেশন শেষে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।