ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রাজশাহী মহানগরী
রাজশাহীতে বর্ষাকাল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও এডিস মশার উপদ্রব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার প্রজনন ও লার্ভার উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে গত ৩ থেকে ১০ আগস্ট নগরীর কাজিহাটা, চণ্ডিপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা এবং হাজরাপুকুর এলাকায় একটি বিশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, পরিদর্শনকৃত ৭৫টি বাড়ির মধ্যে ২৪টিতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে, যার ফলে বাড়ির সূচক দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশ। পাশাপাশি, পরীক্ষা করা ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্রের মধ্যে ৪৬টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়, যা পাত্রের সূচক হিসেবে ৬৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ব্রেটো সূচকের মান ২০-এর বেশি হলে সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু আলোচ্য পাঁচটি এলাকায় ব্রেটো সূচকের মান পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তিন গুণেরও বেশি। সংগৃহীত ৬৮৫টি মশার লার্ভার মধ্যে ৫০৫টি এডিস অ্যালবোপিকটাস, ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি এবং ৯৪টি অন্যান্য প্রজাতির মশা হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। ফুলদানি, প্লাস্টিক ও সিরামিকের টব, ড্রাম, জলমগ্ন মেঝে এবং রঙের বালতির মতো সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রীতে এসব লার্ভার প্রজনন ঘটে।
এর আগে গত মে মাসে পরিচালিত জরিপে ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সর্বশেষ আগস্টের জরিপে এই সূচক প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় নগরীতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জুনের মাঝামাঝিতে রোগীর সংখ্যা হাতে গোনা থাকলেও আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে ১০ আগস্ট হাসপাতালে ৩০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ১১ আগস্ট দুর্ভাগ্যবশত এক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ইনচার্জ ডা. তানজিলুল বারি জানান, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক হলেও চলতি মৌসুমে রোগীর সংখ্যায় কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া ২০২৫ সালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৯৭ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীই স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর স্থায়ী সংক্রমণের মারাত্মক ইঙ্গিত দেয়।
জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সাধারণ গৃহস্থালি পাত্রে পানি জমে থাকার কারণেই এডিস মশা বংশ বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার জানান, ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা জটিল হলেও নগরীতে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই উচ্চ ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি নগরবাসীর প্রতিটি পরিবারকে নিজ দায়িত্বে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং জমে থাকা পানি অপসারণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।