ক্ষমতার শূন্যতা থেকে সাংবিধানিক রূপান্তর
২০২৪ সালের আগস্ট মাসের প্রথমার্ধ্ব। বৈশ্বিক কূটনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় রাজনৈতিক ভূমিকম্প প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশ। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে লৌহকঠিন নিয়ন্ত্রণে থাকা শেখ হাসিনা সরকারের আকস্মিক ও নাটকীয় পতন কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল ছিল না; এটি ছিল এক নতুন রাষ্ট্র গঠনের সূচনার ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রক্ষমতার এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী রূপরেখা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। ৫ আগস্ট দুপুরে যখন সেনাপ্রধানের ভাষণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত হলো, তখন থেকেই শুরু হয় এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা ও তা পূরণের অন্তহীন দৌড়ঝাঁপ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ডে এই তিন দিনের ট্রানজিশন পিরিয়ড বা ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কালটি ছিল চরম অনিশ্চয়তা, স্নায়ুযুদ্ধ এবং পর্দার পেছনের বহু নাটকীয় সমীকরণে ভরপুর।
৫ আগস্ট বিকেলে যখন রাজধানী ঢাকার রাজপথ উল্লাসে মুখরিত, ঠিক তখনই সেনাসদরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক শুরু হয়। কিন্তু এই সংকটময় মুহূর্তে ছাত্র নেতারা এক ঐতিহাসিক ও সাহসী অবস্থান নেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে ক্যান্টনমেন্টে যোগ দেওয়ার তাগিদ আসলেও ছাত্ররা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ছিল—"দেশের ভাগ্য কোনো সেনানিবাসে নির্ধারিত হতে পারে না, তা নির্ধারিত হবে রাজপথের জনতার মঞ্চ থেকে।" এই অনমনীয় অবস্থানই মূলত পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথের মূল ভিত্তি স্থাপন করে দেয়। একই সঙ্গে তৎকালীন সময়ে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্র নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে ছাত্ররা রাষ্ট্র সংস্কার এবং ৫০ শতাংশ রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও ৫০ শতাংশ সুশীল সমাজ-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকারের রূপরেখা পেশ করেন। তবে বিএনপি সেই প্রস্তাব এড়িয়ে গিয়ে একটি স্বল্পপরিসরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দ্রুত সাধারণ নির্বাচনের আয়োজনের ওপর জোর দেয়। ফলস্বরূপ, রাজনৈতিক ঐকমত্যের চিরায়ত ছক ভেঙে নতুন এক বিকল্পের সন্ধানে নামতে বাধ্য হয় ছাত্র নেতৃত্ব।
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে ছাত্ররা এমন এক ব্যক্তিত্বের সন্ধান করেন যিনি কেবল দেশবাসীর কাছেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমাদৃত ও অবিসংবাদিত। আন্দোলনের শুরুর দিক থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশের এই সংকটকালীন চালিকাশক্তি হিসেবে ভাবছিলেন ছাত্রনেতারা। ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় যখন ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও অস্ত্রোপচারের ঠিক আগমুহূর্তে ড. ইউনূসের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়, তখন বিশ্বমঞ্চের এই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব দেশের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। সেনাসমর্থিত বা কোনো অসাংবিধানিক সরকার গঠন করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না-ছাত্রদের এই আপসহীন অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিতে ইতিবাচক সম্মতি জানান। ওই রাতেই ভিডিও বার্তা প্রকাশের মাধ্যমে জাতির সামনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন ছাত্র নেতারা।
এর পরের ৭২ ঘণ্টা বাংলাদেশ পার করে এক চরম সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্য দিয়ে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এই পরিস্থিতিতে ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসে ছাত্র প্রতিনিধিদল। সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও অংশীজনদের সঙ্গে অন্তহীন বৈঠক এবং দীর্ঘ দরকষাকষির মধ্য দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি তখন ঢাকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই অভাবনীয় কৌশলের দিকে।
অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ৮ আগস্ট ফ্রান্স থেকে ঢাকায় অবতরণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিমানবন্দরে পা রেখেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং দেশে সুশাসন ফিরিয়ে আনাই তার প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ওই দিনই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন অধ্যাপক ইউনূস। তাঁর সঙ্গে শপথ নেন বিভিন্ন পেশা থেকে উঠে আসা বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। এর পরপরই দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতার পক্ষে ঐতিহাসিক মতামত প্রদান করে। বিশ্ব গণমাধ্যমে এই ঘটনাকে অভিহিত করা হয় ইতিহাসের অন্যতম অনন্য এক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে, যার মধ্য দিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জন্ম লাভ করে এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।