প্রিয়জন হারানোর পর যে ডিজিটাল জটিলতায় পড়ছে পরিবার
মানুষের প্রস্থান কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়, এটি বর্তমান যুগে রেখে যায় এক বিশাল ডিজিটাল ছায়া। বাস্তবের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব, জমি বা গয়নার উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবার যতটা সজাগ, ডিজিটাল উত্তরাধিকারের বিষয়টি ততটাই উপেক্ষিত। যুগের পরিবর্তনে মানুষের জীবন এখন দ্বিমুখী—একটি বাস্তব, অন্যটি ভার্চুয়াল। এই ডিজিটাল পৃথিবীতে জমা থাকে অজস্র পারিবারিক ছবি, ব্যক্তিগত স্মৃতির চ্যাট, ই-মেইল, গোপন নথি, অনলাইন ব্যবসা, ওয়েবসাইট এবং অর্থমূল্যসম্পন্ন নানা সম্পদ। কিন্তু মানুষটির মৃত্যুর পর এসবের অধিকার কার হাতে যাবে? আগাম পরিকল্পনা না থাকায় প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি পরিবারগুলোকে বর্তমানে পড়তে হচ্ছে মারাত্মক ডিজিটাল জটিলতা ও আইনি সংকটে।
ডিজিটাল স্মৃতির গোলকধাঁধা ও আইনি জটিলতা:-
বর্তমান একজন সাধারণ মানুষের অনলাইন পরিসর বেশ বিস্তৃত। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল, গুগল ড্রাইভ, ক্লাউড স্টোরেজ, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, বিকাশ, ব্যাংকিং অ্যাপ থেকে শুরু করে ই-কমার্স অ্যাকাউন্ট ও ডোমেইন হোস্টিং-সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত অস্তিত্ব। একজন ফটোগ্রাফারের সারাজীবনের কষ্টের সৃষ্টি ক্লাউডে বন্দি থাকে, একজন লেখকের ই-মেইলে লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, আর কোনো উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে একটি আস্ত প্রতিষ্ঠান। মৃত্যুর পর এসবের পাসকোড বা অ্যাকসেস না থাকায় অনেক সময় চিরতরে হারিয়ে যায় বহু অমূল্য স্মৃতি ও আয়ের উৎস।
বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মৃত্যুর পরের নীতিমালা:-
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট সুরক্ষায় নিজস্ব নীতিমালা চালু করেছে। ফেসবুকের ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রমাণ দিয়ে প্রোফাইলকে ‘মেমোরিয়ালাইজড অ্যাকাউন্ট’-এ রূপান্তর করা যায়, যেখানে কেউ লগইন করতে পারে না তবে বন্ধুরা স্মৃতিচারণ করতে পারে। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ‘লিগ্যাসি কনট্যাক্ট’ যুক্ত করে রাখলে কিছু নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব, কিংবা চাইলে অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার নির্দেশও দিয়ে যাওয়া যায়। একক ব্যক্তির পরিচালনাধীন ব্যবসায়িক ফেসবুক পেজ বা গ্রুপগুলোর ক্ষেত্রে একাধিক অ্যাডমিন না থাকলে মৃত্যুর পর সেগুলো চিরতরে বন্ধ বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গুগল ব্যবহারকারীদের জন্য রেখেছে ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’ নামক অত্যন্ত কার্যকরী ফিচার। নির্দিষ্ট সময় অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় থাকলে কার কাছে ডেটা যাবে বা অ্যাকাউন্ট মুছে যাবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা যায়। অন্যদিকে অ্যাপল ব্যবহারকারীরা ‘লিগেসি কনট্যাক্ট’-এর মাধ্যমে বিশ্বস্ত কাউকে অ্যাকসেস-কি দিয়ে যেতে পারেন, যার মাধ্যমে মৃত্যুর পর ছবি ও প্রয়োজনীয় ফাইল সংগ্রহ করা যায়। তবে পাসওয়ার্ড সরাসরি কোনো কাগজে লিখে রেখে যাওয়া কোনো নিরাপদ সমাধান নয়, কারণ এতে তথ্য চুরির ঝুঁকি কিংবা সাইবার সিকিউরিটি নীতির লঙ্ঘন ঘটতে পারে।
অর্থনৈতিক ডিজিটাল সম্পদ ও ডিজিটাল উইল:-
ডিজিটাল উত্তরাধিকার কেবল ছবি বা সোশ্যাল মিডিয়ার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে ডোমেইন-হোস্টিং, ইউটিউব চ্যানেল, মনিটাইজড ফেসবুক পেজ, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, পেইড সফটওয়্যার এবং রয়্যালটি আয়। সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে ডোমেইনের মেয়াদ শেষ হয়ে একটি লাভজনক অনলাইন ব্যবসাও চোখের পলকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই প্রচলিত উইলের পাশাপাশি এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল উইল’ বা ডিজিটাল উত্তরাধিকার পরিকল্পনা। পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করে জরুরি তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি কোন ডেটা থাকবে আর কোনটি চিরতরে মুছে যাবে, তার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে যাওয়া জরুরি।
এখনই করণীয় ও শেষ কথা:-
শারীরিক মৃত্যুর মতো ডিজিটাল জীবনেরও একটি অবধারিত সমাপ্তি রয়েছে। তাই সময় থাকতেই নিজের গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর তালিকা তৈরি করা, বিশ্বস্ত লিগ্যাসি কনট্যাক্ট বা উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করা এবং ক্লাউড ব্যাকআপ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নমিনি সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি প্রয়োজনে আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে ডিজিটাল সম্পদকে উইলের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। মানুষ চলে গেলেও তার কণ্ঠস্বর, ছবি ও অনলাইন পরিচয় থেকে যায় বছরের পর বছর। তাই শেষ লগআউটের আগেই নিজের ডিজিটাল জীবনের চাবিকাঠি কার হাতে থাকবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব একান্তই আপনার।