ইউএনও বদলির পর বাঘা উপজেলায় প্রশাসনিক সংকট, পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ পদে কার্যক্রমে স্থবিরতার আশঙ্কা
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তারের বদলির পর উপজেলাজুড়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব অতিরিক্ত হিসেবে পালন করায় তাঁর বদলির পর একযোগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদের দায়িত্ব শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে দাপ্তরিক অনুমোদন, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, পৌর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নাগরিক সেবায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার বাঘা উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর। অভিযোগ ওঠে, নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পরে পরীক্ষা শুরু হয়। পাশাপাশি সুপারভাইজার পদের ফলাফল প্রকাশ করা হলেও তথ্য সংগ্রহকারী পদের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন।
পরীক্ষা শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ইউএনওর পদত্যাগ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি এবং প্রার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে।
বাঘা পৌর বিএনপির সভাপতি কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক তফিকুল ইসলাম তফি বলেন, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। প্রশাসনের আশ্বাসের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরদিন রোববার রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জনস্বার্থে ইউএনও শাম্মী আক্তারকে নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলায় বদলি করা হয়।
জানা গেছে, বিদায়ী ইউএনও শাম্মী আক্তার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব, বাঘা পৌরসভার প্রশাসক, আড়ানী পৌরসভার প্রশাসক এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে তাঁর বদলির পর এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব একযোগে শূন্য হয়ে যায়।
এদিকে নতুন কোনো কর্মকর্তা যোগদান না করা কিংবা বিকল্পভাবে দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি, সরকারি প্রকল্পের অনুমোদন, পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিভিন্ন দাপ্তরিক ফাইল নিষ্পত্তি এবং নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রমে সাময়িক বিলম্ব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন বিদায়ী ইউএনও শাম্মী আক্তার। তিনি বলেন, সরকারি বিধিমালা ও নীতিমালা অনুসরণ করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর অভিযোগ ছড়িয়ে প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও জানান, দায়িত্ব হস্তান্তর ও পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে এবং নতুন দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দ্রুত নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ অথবা অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা জরুরি। অন্যথায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাপ্রাপ্তি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।