আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আজ
পেনশনের টাকার জন্য ঢাকার ২ নম্বর শ্রম আদালতে হাজিরা দিতে দিতে পেরেশান ষাটোর্ধ্ব তবারক হোসেন। টানা ৩২ বছর একটি জুট মিলে চাকরি করেছেন। অবসরের সময় তিনি পাননি ন্যায্য পাওনা। শ্রম ঘামের দামের জন্য সুবিচার পেতে তবারক যান আদালতে। তবে ৩ বছরে একাধিকবার শুনানি পেছানো আর আসামিপক্ষের আদালতে হাজির না হওয়ায় ত্যক্ত বিরক্ত তিনি। এখন মামলা তুলে নিতে তাঁকে দেওয়া হচ্ছে চাপ। না হলে টাকা না পাওয়ার হুঁশিয়ারিও আসছে।
তবারক হোসেনের মতো অধিকার আদায় করতে আসা হাজারো শ্রমজীবীর আদালতের দিনলিপি এমনই অনিশ্চয়তার। এই পটভূমিতে আজ পালিত হচ্ছে মহান মে বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রম আইনে দায়ের করা মামলা নিষ্পত্তিতে নির্ধারিত সময়ের ১০ গুণ বেশি সময় লাগছে। আর রায়ের পর ক্ষতিপূরণ পেতে সময় লাগছে আরও এক বছরের বেশি।
এ পরিস্থিতিতে শ্রমবিরোধ ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বর্তমানে ঢাকা শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল ও দেশের ১৩টি শ্রম আদালতে ঝুলে আছে ২৭ হাজার ৮৭৬টি মামলা। নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হওয়ায় অসহনীয় ভোগান্তিতে বিচারপ্রার্থী মানুষ।
দেশের শ্রম আদালতে বিচারাধীন এসব মামলার বেশিরভাগই পোশাক খাতের শ্রমবিরোধ ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের। কারখানা বন্ধ ঘোষণা, চাকরিচ্যুতি, অবসরের পর সুবিধাদি না দেওয়া, বেতন আটকে রাখা, দেরিতে বেতন দেওয়ার অভিযোগে এসব মামলা করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। মামলা নিস্পত্তিতে দীর্ঘ সময়ও চলে যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন আদালতে দিন দিন বাড়ছে মামলার স্তূপ।
অন্যদিকে, কাগজে কলমে শ্রম অধিকার নিয়ে বিভিন্ন মহল সোচ্চার হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। শ্রমিকের অধিকার বুঝিয়ে দিতে এখনও গড়িমসি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। শ্রমিকের অধিকার আদায়ে তাই গঠন করা হয় শ্রমিক আদালত। ধীরগতির বিচারের কারণে শ্রমজীবী বিচারপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মামলার পরিসংখানঃ-
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন অভিযোগে শ্রম আদালতগুলোতে মামলা করেন শ্রমজীবীরা। ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতে নানা আইনি জটিলতায় মামলার জট লেগে আছে দীর্ঘদিন।
মামলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ঢাকা শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ১১৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশে ৭০টি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত আছে। এছাড়া ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে ৪ হাজার ৫৬০টি, দ্বিতীয় শ্রম ট্রাইব্যুনালে ৬ হাজার ৪২০টি এবং তৃতীয় শ্রম ট্রাইব্যুনালে ৩ হাজার ১৯৫টি মামলা বিচারাধীন।
এদিকে, চট্টগ্রাম প্রথম শ্রম আদালতে ১ হাজার ৬৮২, দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৮৭৯, খুলনায় ১৭৩, রাজশাহীতে ৮৭, রংপুরে ১০৭, সিলেটে ৬৫, বরিশালে ৮৭, নারায়নগঞ্জে ২ হাজার ৮৭০, কুমিল্লায় ৩২৬ এবং গাজীপুর শ্রম আদালতে ৬ হাজার ৩১২ মামলা বিচারাধীন আছ। তবে এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মামলার বিচার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। সর্বশেষ গত মার্চের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, সারাদেশে ৪৬০ মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৩১টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার চাপ বেশি থাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহে চালু করা হয়েছে শ্রম আদালত। সেখানে চেয়ারম্যানও নিয়োগ হয়েছে। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ সম্পন্ন হলেই বিচার কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি গাজীপুরে আরেকটি শ্রম আদালত করার আলোচনা চলছে।
কেন ঝুলে থাকে মামলাঃ-
শ্রম আইনে মামলার দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, শ্রম আইনের মামলাগুলো ৬০ দিনে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হলে উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করে আরও ৯০ দিন সময় দেওয়া যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মামলা ৯০ সপ্তাহেও নিষ্পত্তি হয় না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, শ্রম আইনে বলা হয়েছে, দুই বা ততোধিক বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল চলবে।
শ্রম আদালতের প্রধান বিচারককে বলা হয় চেয়ারম্যান। যিনি জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক। মামলার সিদ্ধান্ত দেওয়ার দিন অতিরিক্ত আরও দুজন সদস্য বা বিচারক থাকেন এজলাসে। সেখানে দু’পক্ষই আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করে থাকেন। শ্রম আদালতগুলোতে মামলা শুনানির জন্য ধার্য তারিখ হয় বছরে তিন থেকে চারবার। ফলে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে অনেক শ্রমিকই মালিক পক্ষের সঙ্গে আপস মীমাংসায় যেতে বাধ্য হন। আর তখনই শুধু মামলা কিছুটা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
এছাড়াও বিচারক না থাকা, মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, সমন জারিতে বিলম্ব, জবাব দাখিলে আইনজীবীদের বারবার সময় নেওয়া, প্রতিনিধিদের মতামত দিতে দেরির কারণে শ্রম আদালতে অনেক মামলার বিচার ঝুলে আছে।
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, নতুন মামলার পাশাপাশি পুরাতন মামলা নিস্পত্তিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে মামলাও হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমাদের প্রয়াসের কমতি নেই।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যঃ-
জানতে চাইলে বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের লিগ্যাল স্পেশালিস্ট অ্যাডভোকেট সিফাত-ই নুর খানম সমকালকে বলেছেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ে নানা রকম বাধা আছে। মামলা করা হলেও সময়মতো এসব মামলা নিষ্পত্তি হয় না। ফলে তারা হয়ে পড়েন ধৈর্যহারা। এতে করে এসব মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে। তাছাড়া মালিকপক্ষ মামলার শেষ সময়ে এসে নানা রকম আপত্তি জানায়। ফলে শ্রমিক আর প্রতিকার পান না।
তিনি যোগ করেন, শ্রম আদালতের মামলাগুলোকে কাগজে-কলমে স্পেশাল ল' বলা হলেও বাস্তবে সেটা না। শ্রম আদালতে একটা মামলা নিস্পত্তি হতে ৬ ৭ বছর সময় লেগে যায়। আমাদের কাছে এমন মামলা আছে যেটা ২০০৭-০৮ সালে দায়ের হয়েছে, কিন্তু এখনও নিস্পত্তি হয়নি।