বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল ২০২৬
হোমঅর্থনীতিভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে

ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে

favicon
উপচার ডেস্ক :-
ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে

যে ধানের শীষে সোনালি স্বপ্ন বুনেছিলেন কৃষক, সেই পাকা ফসল এখন পানির নিচে। কষ্টের ঘাম মিশে যে ধানের সোনালি ছড়ায় চোখ বুলিয়ে ঠোঁটে হাসি জমাচ্ছিলেন, তার সবকিছু একনিমেষে তলিয়ে যাচ্ছে অতিবৃষ্টির পানিতে। একজন কৃষকের কাছে এই ধান শুধু ফসল নয়, তাঁর পরিবারের আশা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, তাঁর সারা বছরের বেঁচে থাকার ভরসা। সেই ভরসা যখন পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, তখন শুধু ফসল নয়, ডুবে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্নের হাসিমাখা আগামীও।


গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে আবারও বিপর্যস্ত  দেশের হাওরাঞ্চল। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় এখনো প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির অধিকাংশ ধান পানির নিচে, যা মোট আবাদের অন্তত ৩৮ শতাংশ।

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বোরো মৌসুম সারা বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এই ফসলের ওপর নির্ভর করেই সংস্থান হয় পুরো বছরের সংসারের খাবার। চাষের জন্য যে ঋণ নিয়েছেন তা পরিশোধের পর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কিন্তু গত কদিনের অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান কতটুকু সংগ্রহ করা যায় সে পরামর্শ দিতে জরুরি ভিত্তিতে রাজধানী থেকে ১৪ জন কৃষি কর্মকর্তা গত ২৮ এপ্রিল ছুটে গেছেন হাওরাঞ্চলে।

সেখানে অবস্থান করে তাঁরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কিভাবে উদ্ধার করা যায়। তবে এই হঠাৎ বিপর্যয়ে কৃষক কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি সরকারের কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে হঠাৎ এই অতিবৃষ্টির কারণে হাওরাঞ্চলে পশুখাদ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে হাওরের সাত জেলায় মোট চার লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ লাখ ২৫ হাজার ২৫০ টন।

এর মধ্যে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৮২ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, যা মোট আবাদের প্রায় ৬২ শতাংশ। বাকি ৩৮ শতাংশ জমির ধান এখন পানির নিচে ক্ষতির মুখে। এই জমিতে সাত লাখ ৩১ হাজার ৫৯৫ টন ধান হওয়ার কথা ছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আবু জাফর আল মুনছুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টানা বর্ষণে হাওরের বেশির ভাগ বেসিন ডুবে যাওয়ায় গতকাল বুধবার ধান কাটা কার্যত বন্ধ ছিল। মাঠে যেসব ধান রয়েছে, তার অধিকাংশই পাকা। দ্রুত পানি নেমে গেলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সেগুলো কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হতে পারে। এতে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। ফলে জাতীয় উৎপাদনে বড় ধাক্কা না লাগলেও স্থানীয় কৃষকের ক্ষতি হবে ব্যাপক।’


কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার সবচেয়ে বেশি বোরো আবাদ হয়েছে সুনামগঞ্জে। জেলায় এক লাখ ৬৩ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। কিশোরগঞ্জে এক লাখ চার হাজার ৫৮১ হেক্টর, হবিগঞ্জে ৫৬ হাজার ৯২৪ হেক্টর, নেত্রকোনায় ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর, সিলেটে ৩৭ হাজার ৬২৬ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ হাজার ৩২৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪০০ টন।

এদিকে হাওরে পানি বাড়তে থাকায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বাঁধ উপচে বা ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে ফসলের মাঠে। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, এবার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি বাঁধ অতিক্রম করে হাওরে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে টানা চার দিনের ভারি বৃষ্টিতে হাওরের পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে ধান তলিয়ে যায়। বাঁধ থাকায় অতিরিক্ত পানি সহজে নদীতে নামতে পারেনি। একই সময় পাহাড়ি ঢলে নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।


নেত্রকোনার জারিয়া-জাঞ্জাইল এলাকার কংশ ও ভোগাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানি আরো বাড়লে তা বন্যার রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

হাওরের কৃষকরা বলছেন, তাঁরা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু আচমকা পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেকের জমির ধান এখন ১০ থেকে ১৫ ফুট পানির নিচে।

নলুয়া হাওরের ভুরাখালি গ্রামের কৃষক চাঁন মিয়া বলেন, ‘চার হাল জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। দুই হালের ধান কাটতে পারছি। বাকি দুই হালের পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। এখন মাড়াইও করতে পারছি না, ধান শুকানোও যাচ্ছে না।’


শুধু ধান নয়, হাওরের পানি বাড়ায় তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর। খড় ও ঘাসের মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাঁদের গরু-ছাগল অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া বদ্ধ পানিতে পচন ধরায় হাওর এলাকার বাতাস ও পানি দূষিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া হাওরাঞ্চলকে রক্ষা করা সম্ভব না। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও ধান বিজ্ঞানী ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাওরের জন্য বিশেষ উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন করতে হবে। এমন ধান চাষ বাড়াতে হবে, যেগুলো কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি কম হয়।’

তিনি বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি বা শর্ট ডিউরেশনের ধান হাওরে আবাদ বাড়ানো জরুরি, যাতে এপ্রিলের শুরুতেই ধান কেটে ফেলা যায়। ব্রি ধান-১১৭ হাওর এলাকার জন্য উপযোগী একটি কোল্ড টলারেন্ট জাত।

ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘বর্তমানে শ্রমিকসংকটও হাওরের ধান কাটার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে শ্রমিকরা মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে পাকা ধান দীর্ঘ সময় মাঠে পড়ে থাকছে।’


কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সম্ভাব্য বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কথা মাথায় রেখে আগেই দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জমির ধান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাটতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে সেই উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হয়নি।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলায় এখন পর্যন্ত ৮৯৭ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ হাওরে ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। বৃষ্টি কমলে দ্রুত বাকি ধান কাটা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’

হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ, নতুন মৌসুমের জন্য বিনাসুদে ঋণ, বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।’

একই সঙ্গে যেসব এলাকায় এখনো ধান পুরোপুরি তলিয়ে যায়নি, সেখানে সরকারি উদ্যোগে কম্বাইন হারভেস্টার ও অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠিয়ে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছরের এই পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ মোকাবেলায় শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং হাওর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কৃষকের এই দুর্ভোগ কমবে না।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণায়ের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও পরিবারের সহায়তার জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থ সহযোগিতা করা হবে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


ঢাকা থেকে যাওয়া সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় অবস্থানরত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নিজামুল হক পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও অনেক কৃষক এরই মধ্যে ধান কাটা শুরু করেছেন। মাঠে ধান কাটার যন্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বৃষ্টি থামলেই দ্রুত ধান কাটা শুরু হবে। যন্ত্রের মাধ্যমে ধান কাটতে বেশি সময় লাগবে না। এ ছাড়া কৃষকদের সুবিধার্থে ধান কাটার যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহে ফুয়েল কার্ডও দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, এখানকার কৃষকরা সচেতন হলেও ধানের জাত নির্বাচনে অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনা করতে পারেন না। কৃষকদের দাবি, এবার ধান পাকতে দেরি হয়েছে। ফলে ধান কাটতেও দেরি হয়েছে এবং অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
৩০ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উপচার
 বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল ২০২৬
হোমঅর্থনীতিভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে

ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে

favicon
উপচার ডেস্ক :-
ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে

যে ধানের শীষে সোনালি স্বপ্ন বুনেছিলেন কৃষক, সেই পাকা ফসল এখন পানির নিচে। কষ্টের ঘাম মিশে যে ধানের সোনালি ছড়ায় চোখ বুলিয়ে ঠোঁটে হাসি জমাচ্ছিলেন, তার সবকিছু একনিমেষে তলিয়ে যাচ্ছে অতিবৃষ্টির পানিতে। একজন কৃষকের কাছে এই ধান শুধু ফসল নয়, তাঁর পরিবারের আশা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, তাঁর সারা বছরের বেঁচে থাকার ভরসা। সেই ভরসা যখন পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, তখন শুধু ফসল নয়, ডুবে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্নের হাসিমাখা আগামীও।


গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে আবারও বিপর্যস্ত  দেশের হাওরাঞ্চল। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় এখনো প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির অধিকাংশ ধান পানির নিচে, যা মোট আবাদের অন্তত ৩৮ শতাংশ।

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বোরো মৌসুম সারা বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এই ফসলের ওপর নির্ভর করেই সংস্থান হয় পুরো বছরের সংসারের খাবার। চাষের জন্য যে ঋণ নিয়েছেন তা পরিশোধের পর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কিন্তু গত কদিনের অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান কতটুকু সংগ্রহ করা যায় সে পরামর্শ দিতে জরুরি ভিত্তিতে রাজধানী থেকে ১৪ জন কৃষি কর্মকর্তা গত ২৮ এপ্রিল ছুটে গেছেন হাওরাঞ্চলে।

সেখানে অবস্থান করে তাঁরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কিভাবে উদ্ধার করা যায়। তবে এই হঠাৎ বিপর্যয়ে কৃষক কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি সরকারের কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে হঠাৎ এই অতিবৃষ্টির কারণে হাওরাঞ্চলে পশুখাদ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে হাওরের সাত জেলায় মোট চার লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ লাখ ২৫ হাজার ২৫০ টন।

এর মধ্যে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৮২ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, যা মোট আবাদের প্রায় ৬২ শতাংশ। বাকি ৩৮ শতাংশ জমির ধান এখন পানির নিচে ক্ষতির মুখে। এই জমিতে সাত লাখ ৩১ হাজার ৫৯৫ টন ধান হওয়ার কথা ছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আবু জাফর আল মুনছুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টানা বর্ষণে হাওরের বেশির ভাগ বেসিন ডুবে যাওয়ায় গতকাল বুধবার ধান কাটা কার্যত বন্ধ ছিল। মাঠে যেসব ধান রয়েছে, তার অধিকাংশই পাকা। দ্রুত পানি নেমে গেলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সেগুলো কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হতে পারে। এতে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। ফলে জাতীয় উৎপাদনে বড় ধাক্কা না লাগলেও স্থানীয় কৃষকের ক্ষতি হবে ব্যাপক।’


কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার সবচেয়ে বেশি বোরো আবাদ হয়েছে সুনামগঞ্জে। জেলায় এক লাখ ৬৩ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। কিশোরগঞ্জে এক লাখ চার হাজার ৫৮১ হেক্টর, হবিগঞ্জে ৫৬ হাজার ৯২৪ হেক্টর, নেত্রকোনায় ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর, সিলেটে ৩৭ হাজার ৬২৬ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ হাজার ৩২৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪০০ টন।

এদিকে হাওরে পানি বাড়তে থাকায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বাঁধ উপচে বা ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে ফসলের মাঠে। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, এবার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি বাঁধ অতিক্রম করে হাওরে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে টানা চার দিনের ভারি বৃষ্টিতে হাওরের পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে ধান তলিয়ে যায়। বাঁধ থাকায় অতিরিক্ত পানি সহজে নদীতে নামতে পারেনি। একই সময় পাহাড়ি ঢলে নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।


নেত্রকোনার জারিয়া-জাঞ্জাইল এলাকার কংশ ও ভোগাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানি আরো বাড়লে তা বন্যার রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

হাওরের কৃষকরা বলছেন, তাঁরা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু আচমকা পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেকের জমির ধান এখন ১০ থেকে ১৫ ফুট পানির নিচে।

নলুয়া হাওরের ভুরাখালি গ্রামের কৃষক চাঁন মিয়া বলেন, ‘চার হাল জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। দুই হালের ধান কাটতে পারছি। বাকি দুই হালের পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। এখন মাড়াইও করতে পারছি না, ধান শুকানোও যাচ্ছে না।’


শুধু ধান নয়, হাওরের পানি বাড়ায় তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর। খড় ও ঘাসের মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাঁদের গরু-ছাগল অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া বদ্ধ পানিতে পচন ধরায় হাওর এলাকার বাতাস ও পানি দূষিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া হাওরাঞ্চলকে রক্ষা করা সম্ভব না। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও ধান বিজ্ঞানী ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাওরের জন্য বিশেষ উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন করতে হবে। এমন ধান চাষ বাড়াতে হবে, যেগুলো কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি কম হয়।’

তিনি বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি বা শর্ট ডিউরেশনের ধান হাওরে আবাদ বাড়ানো জরুরি, যাতে এপ্রিলের শুরুতেই ধান কেটে ফেলা যায়। ব্রি ধান-১১৭ হাওর এলাকার জন্য উপযোগী একটি কোল্ড টলারেন্ট জাত।

ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘বর্তমানে শ্রমিকসংকটও হাওরের ধান কাটার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে শ্রমিকরা মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে পাকা ধান দীর্ঘ সময় মাঠে পড়ে থাকছে।’


কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সম্ভাব্য বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কথা মাথায় রেখে আগেই দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জমির ধান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাটতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে সেই উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হয়নি।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলায় এখন পর্যন্ত ৮৯৭ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ হাওরে ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। বৃষ্টি কমলে দ্রুত বাকি ধান কাটা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’

হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ, নতুন মৌসুমের জন্য বিনাসুদে ঋণ, বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।’

একই সঙ্গে যেসব এলাকায় এখনো ধান পুরোপুরি তলিয়ে যায়নি, সেখানে সরকারি উদ্যোগে কম্বাইন হারভেস্টার ও অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠিয়ে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছরের এই পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ মোকাবেলায় শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং হাওর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কৃষকের এই দুর্ভোগ কমবে না।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণায়ের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও পরিবারের সহায়তার জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থ সহযোগিতা করা হবে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


ঢাকা থেকে যাওয়া সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় অবস্থানরত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নিজামুল হক পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও অনেক কৃষক এরই মধ্যে ধান কাটা শুরু করেছেন। মাঠে ধান কাটার যন্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বৃষ্টি থামলেই দ্রুত ধান কাটা শুরু হবে। যন্ত্রের মাধ্যমে ধান কাটতে বেশি সময় লাগবে না। এ ছাড়া কৃষকদের সুবিধার্থে ধান কাটার যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহে ফুয়েল কার্ডও দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, এখানকার কৃষকরা সচেতন হলেও ধানের জাত নির্বাচনে অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনা করতে পারেন না। কৃষকদের দাবি, এবার ধান পাকতে দেরি হয়েছে। ফলে ধান কাটতেও দেরি হয়েছে এবং অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৩৮ শতাংশ ধান ক্ষতির মুখে
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
৩০ এপ্রিল ২০২৬