রামেবিতে অযোগ্যতার অভিযোগে পরিচালক নিয়োগ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি)-এর পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মোঃ ইব্রাহিম কবীরের নিয়োগ ও চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার জমাকৃত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে তিনি সংশ্লিষ্ট পদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ করেন না। এ প্রেক্ষিতে তার নিয়োগ বাতিলের আবেদন ভিসির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রামেবির জনবল নিয়োগের এমপিকিউ (মিনিমাম প্রেসক্রাইবড কোয়ালিফিকেশন) অনুযায়ী সব পদের ক্ষেত্রে প্রার্থীর শিক্ষাজীবনে ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ বা সমমানের গ্রেড থাকতে হবে; কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ রয়েছে, মোঃ ইব্রাহিম কবীরের শিক্ষাজীবনে একটি তৃতীয় বিভাগ থাকায় তিনি এই পদের জন্য অযোগ্য হলেও ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাকে ছয় মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফায় তার চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন বলেন, পরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তিনি অবশিষ্ট কাগজপত্র জমা দেন। যাচাই করে দেখা গেছে, তার কাগজপত্র অনুযায়ী তিনি এই পদের জন্য যোগ্য নন। ফলে নিয়োগ বাতিলের আবেদন করা হয়েছে এবং ভিসির স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন তিনি কীভাবে দায়িত্বে বহাল ছিলেন—এ প্রশ্নে রেজিস্ট্রার বলেন, তার জানামতে তিনি অবৈধভাবেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পূর্ববর্তী কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নেয়নি তা তার জানা নেই। প্রয়োজনে তার বেতন-ভাতাসহ সরকারি অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে বলে তিনি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার পূর্ণাঙ্গ তথ্য গোপন রেখে জীবনবৃত্তান্তে কেবল মাস্টার্স, ডিপ্লোমা ও এমবিএ ডিগ্রির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোঃ ইব্রাহিম কবীর বলেন, তাকে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ৩১ বছর পর এসে তৃতীয় বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, ভিসিই তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তাই এ বিষয়ে ভিসির বক্তব্য নেওয়া উচিত।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, ভিসির ব্যক্তিগত সহকারী মোঃ নাজমুল হোসেন ৯ম গ্রেডের সেকশন অফিসার (অর্থ) হয়েও ৫ম গ্রেডের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন এবং একাধিক আর্থিক পদে দায়িত্বে রয়েছেন। এ বিষয়ে মোঃ নাজমুল হোসেন বলেন, জনবল সংকটের কারণে ভিসি তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তিনি কোনো অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ করছেন না। বর্তমানে ২৭টি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে; নিয়োগ সম্পন্ন হলে তিনি পূর্বের দায়িত্বে ফিরে যাবেন।
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন বলেন, পিএস নাজমুল হোসেনের দায়িত্ব প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটিই অবৈধ এবং এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. মোহাঃ জাওয়াদুল হক ও সংশ্লিষ্ট অর্থ ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তারা অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শীর্ষ কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসে উপস্থিত না থাকায় নথিপত্র ফটোকপি ও ডুপ্লিকেট কাগজে ব্যাকডেটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ভিসি অধ্যাপক ডা. মোহাঃ জাওয়াদুল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে একই ব্যক্তির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও বারবার মেয়াদ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমপিকিউ অনুযায়ী যোগ্যতা নিশ্চিত ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সুশাসন প্রশ্নের মুখে পড়বে।