মবের শিকার হয়ে ক্লাসরুম ছাড়া ১২০০ শিক্ষক
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজনের বিপরীতে দেশের শিক্ষাঙ্গনে দৃশ্যমান হয়েছে এক চরম মানবিক সংকট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া উচ্ছৃঙ্খল মব সংস্কৃতির শিকার হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অন্তত ১ হাজার ২০০ শিক্ষক এখনও নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারেননি। শারীরিক লাঞ্ছনা ও সামাজিক অপমানের শিকার এই শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় ধরে আদালতের বারান্দা, শিক্ষা প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার পাচ্ছেন না।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের সহস্রাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র লেখানো, মারধর এবং জুতার মালা পরানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদেরও একযোগে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা চাকরি ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে তিন শতাধিক রিট মামলা দায়ের করেন। আদালত একাধিক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পক্ষে রায় দিলেও এবং মন্ত্রণালয় থেকে পুনর্বহালের নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির বাধার মুখে অনেক শিক্ষক এখনও শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে পারছেন না।
রাজধানীর আনন্দময়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগম এবং মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা রানী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের মতো অসংখ্য শিক্ষক মাসের পর মাস বেতন-ভাতা বঞ্চিত হয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শিক্ষা ভবনে ডিজিটালাইজড পাসওয়ার্ড আটকে রেখে এবং নানা প্রশাসনিক অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
মাউশির আইন শাখার কর্মকর্তারা জানান, অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে নেওয়া জোরপূর্বক পদত্যাগের কোনো আইনি বৈধতা নেই। বিধিমোতাবেক শোকজ ছাড়া কাউকে বরখাস্ত করা যায় না এবং পরিপত্র অনুযায়ী ১৮০ কর্মদিবস পর সংশ্লিষ্টদের চাকরি পুনর্বহালযোগ্য। তবে মাউশিতে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার না থাকায় অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলছে। অপরদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্থানীয় প্রভাবশালী ও পরিচালনা পর্ষদের অসহযোগিতাকে সরকারি আদেশ বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অপরাধ বা দুর্নীতি থাকলে তা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যেভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে। শিক্ষক সমাজের নিরাপত্তা ও সম্মান পুনরুদ্ধারে অনতিবিলম্বে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে নির্দোষ শিক্ষকদের পুনর্বাসন, নিরাপত্তা বিধান এবং বকেয়া বেতন-ভাতা ছাড় করার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।