বুধবার , ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমজাতীয়শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের

শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের

favicon
উপচার ডেস্ক :-
শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের

সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির বাধ্যতামূলক পূর্বানুমোদন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির একক খেয়ালখুশি কিংবা সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অকার্যকর বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আনুষ্ঠানিক সভার রেজুলেশন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির সভাপতির একক মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রমকেও আইনবহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনার ফলে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির ইচ্ছামতো শিক্ষক বহিষ্কারের অপসংস্কৃতি বন্ধ হলো।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের বরখাস্ত হওয়া সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে স্বপদে পুনর্বহালে ঢাকা বোর্ডের আদেশ বহাল রেখে এবং গভর্নিং বডির রিট আবেদন সরাসরি খারিজ করে বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে রিটকারী গভর্নিং বডির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুজ্জামান এবং ভুক্তভোগী শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালের নভেম্বরে এক নারী শিক্ষকের দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গচিহাটা কলেজের অধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। শিক্ষক লিখিতভাবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতির টেলিফোনিক নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডি ওই শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর দেখায়। পরবর্তীতে বিষয়টি অনুমোদনের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হলে বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’ গভর্নিং বডির বরখাস্তাদেশ নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে পূর্ণ বকেয়া বেতন-ভাতাসহ স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। ঢাকা বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছিলেন গভর্নিং বডির সভাপতি। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট রিটটি পুরোপুরি খারিজ করে বোর্ডের আদেশই আইনসঙ্গত বলে রায় দেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বেসরকারি শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কঠোর আইনি নির্দেশনা অনুসরণের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আদালত বলেন, অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত শিক্ষককে নোটিশের জবাব ও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ন্যূনতম সাত দিনের সুস্পষ্ট সময় দিতে হবে। নোটিশে প্রস্তাবিত শাস্তির মাত্রা উল্লেখসহ শিক্ষক ব্যক্তিগত শুনানি চান কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া তদন্ত কমিটি গঠনে গভর্নিং বডির বৈধ সভার আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন থাকা বাধ্যতামূলক; সভাপতির মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশে গঠিত কমিটি সম্পূর্ণ অবৈধ।

আদালত মামলার নথিপত্রে ঘটনার তারিখ সংক্রান্ত গুরুতর অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন, অভিযোগের ভিন্ন ভিন্ন তারিখ উপস্থাপন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সংকুচিত করায় এ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। রায়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করা হয়, গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্তের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখে না, তারা কেবল শাস্তির প্রস্তাব করতে পারে। বোর্ডের অনুমোদনকে কোনোভাবেই ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

মামলা চলাকালীন সময়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক আবুল মনসুর ইতোমধ্যে স্বাভাবিক অবসরের বয়সসীমায় পৌঁছানোয় তাঁকে সরাসরি চেয়ারে পুনর্বহালের সুযোগ না থাকলেও, অবসরের দিন পর্যন্ত তাঁর সমুদয় বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকুরিকালীন অন্যান্য আর্থিক সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন প্রদান নিশ্চিত করতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 বুধবার , ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমজাতীয়শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের

শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের

favicon
উপচার ডেস্ক :-
শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের

সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির বাধ্যতামূলক পূর্বানুমোদন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির একক খেয়ালখুশি কিংবা সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অকার্যকর বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আনুষ্ঠানিক সভার রেজুলেশন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির সভাপতির একক মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রমকেও আইনবহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনার ফলে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির ইচ্ছামতো শিক্ষক বহিষ্কারের অপসংস্কৃতি বন্ধ হলো।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের বরখাস্ত হওয়া সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে স্বপদে পুনর্বহালে ঢাকা বোর্ডের আদেশ বহাল রেখে এবং গভর্নিং বডির রিট আবেদন সরাসরি খারিজ করে বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে রিটকারী গভর্নিং বডির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুজ্জামান এবং ভুক্তভোগী শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালের নভেম্বরে এক নারী শিক্ষকের দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গচিহাটা কলেজের অধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। শিক্ষক লিখিতভাবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতির টেলিফোনিক নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডি ওই শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর দেখায়। পরবর্তীতে বিষয়টি অনুমোদনের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হলে বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’ গভর্নিং বডির বরখাস্তাদেশ নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে পূর্ণ বকেয়া বেতন-ভাতাসহ স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। ঢাকা বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছিলেন গভর্নিং বডির সভাপতি। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট রিটটি পুরোপুরি খারিজ করে বোর্ডের আদেশই আইনসঙ্গত বলে রায় দেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বেসরকারি শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কঠোর আইনি নির্দেশনা অনুসরণের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আদালত বলেন, অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত শিক্ষককে নোটিশের জবাব ও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ন্যূনতম সাত দিনের সুস্পষ্ট সময় দিতে হবে। নোটিশে প্রস্তাবিত শাস্তির মাত্রা উল্লেখসহ শিক্ষক ব্যক্তিগত শুনানি চান কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া তদন্ত কমিটি গঠনে গভর্নিং বডির বৈধ সভার আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন থাকা বাধ্যতামূলক; সভাপতির মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশে গঠিত কমিটি সম্পূর্ণ অবৈধ।

আদালত মামলার নথিপত্রে ঘটনার তারিখ সংক্রান্ত গুরুতর অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন, অভিযোগের ভিন্ন ভিন্ন তারিখ উপস্থাপন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সংকুচিত করায় এ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। রায়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করা হয়, গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্তের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখে না, তারা কেবল শাস্তির প্রস্তাব করতে পারে। বোর্ডের অনুমোদনকে কোনোভাবেই ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

মামলা চলাকালীন সময়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক আবুল মনসুর ইতোমধ্যে স্বাভাবিক অবসরের বয়সসীমায় পৌঁছানোয় তাঁকে সরাসরি চেয়ারে পুনর্বহালের সুযোগ না থাকলেও, অবসরের দিন পর্যন্ত তাঁর সমুদয় বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকুরিকালীন অন্যান্য আর্থিক সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন প্রদান নিশ্চিত করতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

শিক্ষক বরখাস্তে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, যুগান্তকারী রায় হাইকোর্টের
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬