শুক্রবার , ২১ আগস্ট ২০২৬
হোমবিনোদনজহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

জহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

favicon
বিনোদন ডেস্ক:
জহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জহির রায়হান এক কালজয়ী ও ক্ষণজন্মা প্রতিভার নাম। মাত্র ৩৭ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনকে। বাংলা চলচ্চিত্রের বহু ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই কিংবদন্তি নির্মাতার হাত ধরেই রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটেছিল বরেণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতার। সম্প্রতি জহির রায়হানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক বিশেষ পডকাস্টে অংশ নিয়ে চলচ্চিত্রে নিজের আগমন, নাম পরিবর্তন এবং নির্মাতার সঙ্গে কাজের নানান অবিস্মরণীয় স্মৃতি তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ববিতা জানান, শুরুর দিকে রূপালি পর্দায় কাজ করার ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। জহির রায়হান যখন প্রথম তাঁকে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন, তখন তিনি সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে পরিবারের জোরালো ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রের নাম রাখা হয়েছিল ‘সুবর্ণা’। তবে মুক্তির পর ছবিটি দর্শকদের মাঝে খুব বেশি সাড়া ফেলতে পারেনি।

এর প্রায় দুই বছর পর আবারও ববিতাকে মূল নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন জহির রায়হান। সেবারও অনিচ্ছা প্রকাশ করলে নির্মাতা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে এটিই হবে নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম ও শেষ চলচ্চিত্র। মূলত পাকিস্তানি তারকা অভিনেত্রী শবনমের শিডিউল জটিলতার কারণেই সুযোগটি ববিতার কাছে আসে। এরপর পাকিস্তানের একটি উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর অভিনয় জীবন নতুন মোড় নেয়। সেই চলচ্চিত্রটির কাজ চলাকালীন আফজাল চৌধুরীর স্ত্রীর পরামর্শে তাঁর পারিবারিক নাম ‘পপি’ পরিবর্তন করে ‘ববিতা’ রাখা হয়। ভারতে একই নামের একজন অভিনেত্রী থাকায় শুরুতে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত ববিতা নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা মোটেও সহজ ছিল না উল্লেখ করে ববিতা বলেন, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে শুটিং, দীর্ঘ উর্দু সংলাপ মুখস্থ রাখা এবং সরাসরি শব্দগ্রহণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নানা প্রতিকূলতায় সেই ছবিটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

পরবর্তীতে জহির রায়হানের পরিচালনায় ‘শেষ পর্যন্ত’ চলচ্চিত্রে কালজয়ী নায়ক রাজ্জাকের বিপরীতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। সে সময়কার একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে রাজ্জাককে তিনি বাবা সম্বোধন করে অভিনয় করেছিলেন। এর কিছুদিন পরই একই অভিনেতার বিপরীতে রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি চরম অস্বস্তি ও লজ্জায় পড়েন। বিষয়টি লক্ষ্য করে পরিচালক জহির রায়হান তাঁকে বেশ বকাঝকা করেন এবং স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন যে এটি বাস্তব জীবন নয়, নিখাদ পেশাদার অভিনয়। পরিচালকের অনুপ্রেরণায় স্বাভাবিক হয়ে দৃশ্যটি সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ‘সংসার’ ও ‘টাকা আনা পাই’-সহ জহির রায়হানের একাধিক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ববিতা।

জহির রায়হানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু করা এই অভিনেত্রী পরবর্তীতে নিজ মেধা ও দক্ষতায় উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষ তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রে অবিস্মরণীয় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিপুল সমাদৃত হন।

অন্যদিকে জহির রায়হান ‘কখনো আসেনি’, ‘সোনার কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বাহানা’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’ ও ‘জীবন থেকে নেওয়া’র মতো একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি উপহার দিয়ে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’-এর মতো প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন তিনি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুর থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। শিল্প-সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৯২ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

জহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২১ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শুক্রবার , ২১ আগস্ট ২০২৬
হোমবিনোদনজহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

জহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

favicon
বিনোদন ডেস্ক:
জহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প

বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জহির রায়হান এক কালজয়ী ও ক্ষণজন্মা প্রতিভার নাম। মাত্র ৩৭ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনকে। বাংলা চলচ্চিত্রের বহু ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই কিংবদন্তি নির্মাতার হাত ধরেই রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটেছিল বরেণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতার। সম্প্রতি জহির রায়হানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক বিশেষ পডকাস্টে অংশ নিয়ে চলচ্চিত্রে নিজের আগমন, নাম পরিবর্তন এবং নির্মাতার সঙ্গে কাজের নানান অবিস্মরণীয় স্মৃতি তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ববিতা জানান, শুরুর দিকে রূপালি পর্দায় কাজ করার ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। জহির রায়হান যখন প্রথম তাঁকে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন, তখন তিনি সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে পরিবারের জোরালো ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রের নাম রাখা হয়েছিল ‘সুবর্ণা’। তবে মুক্তির পর ছবিটি দর্শকদের মাঝে খুব বেশি সাড়া ফেলতে পারেনি।

এর প্রায় দুই বছর পর আবারও ববিতাকে মূল নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন জহির রায়হান। সেবারও অনিচ্ছা প্রকাশ করলে নির্মাতা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে এটিই হবে নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম ও শেষ চলচ্চিত্র। মূলত পাকিস্তানি তারকা অভিনেত্রী শবনমের শিডিউল জটিলতার কারণেই সুযোগটি ববিতার কাছে আসে। এরপর পাকিস্তানের একটি উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর অভিনয় জীবন নতুন মোড় নেয়। সেই চলচ্চিত্রটির কাজ চলাকালীন আফজাল চৌধুরীর স্ত্রীর পরামর্শে তাঁর পারিবারিক নাম ‘পপি’ পরিবর্তন করে ‘ববিতা’ রাখা হয়। ভারতে একই নামের একজন অভিনেত্রী থাকায় শুরুতে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত ববিতা নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা মোটেও সহজ ছিল না উল্লেখ করে ববিতা বলেন, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে শুটিং, দীর্ঘ উর্দু সংলাপ মুখস্থ রাখা এবং সরাসরি শব্দগ্রহণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নানা প্রতিকূলতায় সেই ছবিটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

পরবর্তীতে জহির রায়হানের পরিচালনায় ‘শেষ পর্যন্ত’ চলচ্চিত্রে কালজয়ী নায়ক রাজ্জাকের বিপরীতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। সে সময়কার একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে রাজ্জাককে তিনি বাবা সম্বোধন করে অভিনয় করেছিলেন। এর কিছুদিন পরই একই অভিনেতার বিপরীতে রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি চরম অস্বস্তি ও লজ্জায় পড়েন। বিষয়টি লক্ষ্য করে পরিচালক জহির রায়হান তাঁকে বেশ বকাঝকা করেন এবং স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন যে এটি বাস্তব জীবন নয়, নিখাদ পেশাদার অভিনয়। পরিচালকের অনুপ্রেরণায় স্বাভাবিক হয়ে দৃশ্যটি সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ‘সংসার’ ও ‘টাকা আনা পাই’-সহ জহির রায়হানের একাধিক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ববিতা।

জহির রায়হানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু করা এই অভিনেত্রী পরবর্তীতে নিজ মেধা ও দক্ষতায় উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষ তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রে অবিস্মরণীয় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিপুল সমাদৃত হন।

অন্যদিকে জহির রায়হান ‘কখনো আসেনি’, ‘সোনার কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বাহানা’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’ ও ‘জীবন থেকে নেওয়া’র মতো একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি উপহার দিয়ে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’-এর মতো প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন তিনি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুর থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। শিল্প-সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৯২ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

জহির রায়হানের জাদুকরী নির্মাণ ও ববিতার নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২১ আগস্ট ২০২৬