স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ২২ মেয়াদ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ হলেও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ পদের যাত্রাপথ কখনোই খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির পদ বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে রাজনৈতিক পালাবদল, সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড, আকস্মিক মৃত্যু, পদত্যাগ এবং সাংবিধানিক সংকটের কারণে। ফলে নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি।
সর্বশেষ সেই ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন একটি অধ্যায়। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসে আরেকটি অসমাপ্ত মেয়াদের নজির হয়ে রইল।
রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত ২২টি রাষ্ট্রপতি মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন মোট ১৮ জন ব্যক্তি। কিন্তু পুরো সাংবিধানিক মেয়াদ সম্পন্ন করার সৌভাগ্য হয়েছে মাত্র তিনজনের। তাঁদের মধ্যে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ও আবদুর রহমান বিশ্বাস একবার করে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেন। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদ একমাত্র রাষ্ট্রপতি হিসেবে টানা দুই পূর্ণ মেয়াদে বঙ্গভবনের দায়িত্ব পালন করে ইতিহাস গড়েন। এছাড়া রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশি সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
স্বাধীনতার সূচনায় রাষ্ট্রপতি :
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
স্বাধীনতার পর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হলে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রপতির পদে আসেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তাঁর পদত্যাগের পর স্পিকার মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তাঁর দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন।
১৯৭৫: রাষ্ট্রপতি পদের সবচেয়ে অস্থির বছর :
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল ছিল সবচেয়ে ঘটনাবহুল ও অস্থির। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
এরপর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনে তিনিও পদত্যাগ করেন। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন রাষ্ট্রপতি পদকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান ও ক্ষমতার পালাবদল:
১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে তিনি নিহত হন।
তাঁর মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
এরপর বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেলেও বেশিদিন পদে থাকতে পারেননি। পরবর্তীতে এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসেন। তবে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়।
গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, তবুও থামেনি পরিবর্তন:
গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। নির্বাচন শেষে তিনি বিচার বিভাগের দায়িত্বে ফিরে যান।
১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি দেশের অন্যতম রাষ্ট্রপতি, যিনি কোনো বড় রাজনৈতিক সংকট ছাড়াই পূর্ণ সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ করেন।
এরপর ১৯৯৬ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আরেকটি পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
নতুন সহস্রাব্দেও অসমাপ্ত মেয়াদের ধারাবাহিকতা:
২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি হন অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন। পরে স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঘিরে সৃষ্ট সংকটের কারণে তিনি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থাকেন।
ব্যতিক্রমী অধ্যায়: আবদুল হামিদ:
২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিল্লুর রহমান। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যু হলে স্পিকার মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে পরপর দুই পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি টানা দশ বছর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি পদের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ: ইতিহাসে নতুন সংযোজন:
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তবে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন। এর ফলে স্বাধীনতার পর আবারও একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ অসমাপ্ত থেকে গেল।
তাঁর পদত্যাগ শুধু একটি সাংবিধানিক ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের দীর্ঘ ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ও বটে।
ইতিহাসের আয়নায় রাষ্ট্রপতি পদ:
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ বারবার দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। কখনো স্বাধীনতার সংগ্রাম, কখনো সামরিক শাসন, কখনো গণঅভ্যুত্থান, আবার কখনো রাজনৈতিক সমঝোতা-প্রতিটি বড় জাতীয় ঘটনার ছাপ পড়েছে বঙ্গভবনের ইতিহাসে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২২টি রাষ্ট্রপতি মেয়াদের মধ্যে অধিকাংশই কোনো না কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, কেউ পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। পূর্ণ সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ করার ঘটনা বরং ব্যতিক্রম।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও একটি নতুন অধ্যায়। ফলে স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসে একটি বিষয় স্পষ্ট-রাষ্ট্রপতির কার্যালয় শুধু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ আয়না।