গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্কতা অনিবার্য
আজকের ব্যস্ত শহুরে জীবন মানুষকে ঘরোয়া কাজের জন্য গৃহকর্মীর দিকে নির্ভরশীল করে তুলেছে। রান্না, ঘর পরিচ্ছন্নতা, শিশু ও বৃদ্ধদের দেখাশোনা-সবই তারা করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রমাণ করেছে, ঘরোয়া নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার অভাব কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৮ ডিসেম্বর মা ও মেয়ে নির্মম হত্যার শিকার হন। এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন-পরিবারের গৃহকর্মী। গোয়েন্দা তদন্তে প্রকাশ, একটি সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির তথ্য সংগ্রহ করছে। কোথায় সিসি ক্যামেরা নেই, কোন সময় বাসা ফাঁকা থাকে, শিশু বা বৃদ্ধ কারা থাকেন—এই সব তথ্য তারা চুরির, প্রতারণার এবং হত্যার মতো পরিকল্পিত অপরাধে ব্যবহার করছে।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীনও গৃহকর্মীর হাতে খুন হন। সেই মামলার রায়ে আদালত স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়-নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ, জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা, বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নিবন্ধিত গৃহকর্মী নিয়োগ এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা। এরপরও বাস্তবে এই নির্দেশনা অনেক পরিবার উপেক্ষা করছে।
২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ গৃহকর্মী নিয়োগে ১৪ দফা নিরাপত্তা নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই, পূর্ব কর্মস্থল যাচাই, চলাফেরার পর্যবেক্ষণ, মূল্যবান জিনিস গোপন রাখা, শিশুদের একা না রাখা এবং সন্দেহজনক আচরণ নজরে রাখা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এগুলো জানলেও মানছে না।
রাজশাহী বিভাগের প্রেক্ষাপটেও হুবহু একই ঝুঁকি দেখা গেছে। গত কয়েক বছরে রাজশাহীতে কিছু ঘরোয়া সংঘাত ও খুনের ঘটনায় প্রকাশ পায়, যে ধরনের অপরাধে ঘরোয়া নিরাপত্তার ঘাটতি গুরুতর ভূমিকা রেখেছে। এই ধরনের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, শুধু রাজধানী নয়, দেশের অন্য শহরগুলোকেও গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্ক হতে হবে।
সমাধান স্পষ্ট: গৃহকর্মী নিয়োগের আগে পরিচয় যাচাই, থানায় তথ্য জমা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধদের পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক আচরণ নজরে রাখা এবং অপরাধীর ছদ্মবেশ প্রতিহত করার সচেতনতা অবলম্বন অপরিহার্য। সরকারি সংস্থা ও পুলিশও নিয়মিত সচেতনতা অভিযান চালিয়ে নাগরিকদের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘরোয়া নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তারও অঙ্গ। সচেতনতা ও আইনানুগ পদক্ষেপ ছাড়া নগরবাসী বারবার অনভিপ্রেত ঝুঁকিতে পড়বে। গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্ক না হলে ছোটখাটো অবহেলা বড় অপরাধের জন্ম দেবে-এটি আমাদের ইতোমধ্যে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় দেখার সুযোগ হয়েছে।
নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, এবং যে কোনো অনিয়ম ও অনিরাপদ পরিস্থিতি সরকারের নজরে আনা। অন্যথায়, ঘরোয়া সেবা গ্রহণের স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যই আমাদের নিরাপত্তা ও শান্তিকে হুমকিতে ফেলবে।
- লেখক:-
- মো: মাসুদ পারভেজ চৈাধুরী
- সভাপতি
- জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা,রাজশাহী মহানগর।