শনিবার , ০৪ জুলাই ২০২৬
হোমমতামতবাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ

বাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ

favicon
সাদমান সাকিব :
বাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ

আমার সকাল শুরু হয় কোনো অ্যালার্মের শব্দে নয়, শুরু হয় আব্বুর কণ্ঠে।ঘুমের ঘোরে যখন পুরো পৃথিবীটা নীরব থাকে, তখন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে পত্রিকার পাতার শব্দ আর আব্বুর জোরে জোরে পড়ার আওয়াজ।অনেক মানুষই পত্রিকা পড়ে। কিন্তু আব্বুর পত্রিকা পড়ার ধরনটা একটু আলাদা। কেউ হয়তো চুপচাপ চোখ বুলিয়ে খবর পড়ে চলে যায়, কিন্তু আব্বু পত্রিকাকে শুধু পড়েন না, তিনি যেন সেটাকে অনুভব করেন।চশমাটা নাকের সামনের অংশে নামিয়ে, খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটা খবর পড়েন। কখনো কোনো খবরের কাছে একটু থেমে যান, কখনো আবার নিজের মতো করে প্রতিক্রিয়াও দেন।রাজনীতির খবর পড়ার সময় মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে একটা আফসোস শুনতে পাই। আমি অপেক্ষা করে থাকি, কখন তিনি পত্রিকার খেলাধুলার পাতায় যাবেন।খেলাধুলার খবর পড়ার সময় আব্বুর চোখেমুখে একটা আলাদা আনন্দ দেখতে পাই। আর আমিও তখন অদ্ভুত এক ভালো লাগা অনুভব করি।আব্বুর মুখে প্রায়ই একটা কথা শুনি। হঠাৎ করেই বলে ওঠেন,আমার বাংলাদেশ একদিন ফিফা বিশ্বকাপ খেলবে।আব্বুর এই কথাটা যে শুধু একটা স্বপ্ন নয়, সেটা আমি বুঝতে পারতাম। তার কণ্ঠে একটা বিশ্বাস ছিল।আব্বুর সবচেয়ে পছন্দের খেলা ফুটবল। কারণ যে মানুষ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগার মতো যে সব লিগ আছে সেসবের ম্যাচগুলো মিস করতে চান না, তিনি যে একজন ফুটবলপ্রেমী মানুষ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।আর ফিফা বিশ্বকাপ এলে সেটা আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। যত কাজই থাকুক, সব দ্রুত শেষ করে টেলিভিশনের সামনে বসে যান। দায়িত্বশীল একজন মানুষ থেকে এক মুহূর্তে তিনি যেন হয়ে যান ছোট্ট এক শিশু। টেলিভিশনের স্ক্রিনের মাঝেই হারিয়ে যান।দুই বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার পা এমনভাবে ভেঙে যায়, যেন জীবনটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল।পরে অপারেশনের মাধ্যমে সেটি ঠিক করা হয়। ডাক্তাররা বলেছিলেন ভাঙা হাড় আবার জোড়া লাগাতে হবে। প্লেট আর স্ক্রুর মাধ্যমে সেটি ঠিক করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে বলা হয় ওপেন রিডাকশন ইন্টারনাল ফিক্সেশন।ডাক্তার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, দৌড়ানো, খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আগের মতো বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা, সবকিছু থেকেই দূরে থাকতে হবে।তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, এটা শুধু সাময়িক সমস্যা নয়। এটা এমন একটা সীমা, যেটা আর আগের মতো পার হওয়া সম্ভব নয়।হাঁটতে পারি ঠিকই, কিন্তু সেটা আর আগের মতো স্বাভাবিক হাঁটা নয়। এটা এখন সাবধানে চলার হাঁটা।সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হলো, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ানোর ইচ্ছাটা এখনো আছে। কিন্তু শরীর মনে করিয়ে দেয়, আমি আর আগের জায়গায় নেই।এখন আমি এটাকে মেনে নিয়েছি। হয়তো সারাজীবন এভাবেই চলতে হবে। ধীরে ধীরে, হিসেব করে। নিজের সঙ্গে একটা নীরব সমঝোতার মধ্য দিয়ে।কিন্তু তাহলে আব্বুর দেখা সেই স্বপ্নের কী হবে?আব্বুর পত্রিকা খুলে খেলাধুলার পাতায় কি শুধুই ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল তারকাদের খবর থাকবে?ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, মেসি, নেইমারদের খবরেই কি সব পাতা ভরে থাকবে?আমাদের দেশের ছেলেদের খবর কোথায়?হাজারো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।এসব প্রশ্ন নিয়ে স্কুলে গিয়ে দেখি, ফিফা বিশ্বকাপের মৌসুম চলছে। স্কুলে বন্ধুদের আলোচনার বিষয় শুধুই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল।দুই একটা জার্মানির সমর্থকও ছিল। কিন্তু খেয়াল করতাম, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থক তাদের সঙ্গে তর্কে যেতে চাইত না।তবে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আর সমালোচনা চলত।এভাবেই সব ক্লাস শেষ হলো। স্কুল থেকে বাসায় ফিরলাম।আমি আর এক মুহূর্ত দেরি করলাম না। ছুটে গেলাম আব্বুর কাছে।বললাম,সবাই শুধু আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল নিয়ে মাথা শেষ করছে। বাংলাদেশ কবে ফিফা বিশ্বকাপ খেলবে আব্বু?আমার প্রশ্নটা যেন হঠাৎ করেই ঘরের নীরবতা কেটে দিল।আব্বু তখন চা শেষ করে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। দিনের ক্লান্তিটা শরীর থেকে একটু একটু করে নামছিল।আমার কথা শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শান্তভাবে আমার দিকে তাকালেন।আমি যেন থামতেই পারছিলাম না। এতদিনের জমে থাকা প্রশ্নগুলো একের পর এক বেরিয়ে আসছিল।আব্বু বুঝলেন, শুধু উত্তর দিলে হবে না, আমাকে বিশ্বাস করাতে হবে।তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,অবশ্যই বাংলাদেশ একদিন ফিফা বিশ্বকাপ খেলবে।তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না। ছিল এক ধরনের দৃঢ় বিশ্বাস।তারপর তিনি বাংলাদেশের কয়েকজন ফুটবলারের কথা বলতে শুরু করলেন। বললেন, আমাদের দেশেও প্রতিভার অভাব নেই। শুধু দরকার সঠিক সুযোগ, পরিচর্যা আর সময়।তিনি হামজা চৌধুরীর কথা বললেন, যিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলেছেন এবং বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন আশা তৈরি করেছেন।বললেন জামাল ভূঁইয়ার কথা, যার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দীর্ঘদিন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।বললেন রাকিব হোসেনের কথাও। তার গতি, ড্রিবলিং আর খেলার ধরন নিয়ে আব্বুর চোখে একটা আলাদা আগ্রহ দেখেছিলাম।আরও অনেক খেলোয়াড়ের কথা বললেন। বললেন, হয়তো আজ না, কিন্তু কোনো একদিন এই দেশের ছেলেরাই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াবে।আমি চুপ করে শুনছিলাম।আর ভাবছিলাম, হয়তো আমি আমার এই পা নিয়ে আব্বুর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারব না।তবে মনে মনে বলছিলাম,তোমার স্বপ্ন আমি বুঝি আব্বু।বাংলাদেশকে ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে চাও তুমি।হয়তো একদিন তোমার সেই স্বপ্নের দলে থাকবে তোমারই ছেলে হয়ে কোনো এক সৈনিক।এই ভাবনাটা মনে হতেই ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছিলাম।এতদিন যে প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেগুলোর একটা উত্তর যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম।শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম,তাহলে আমরা কি সত্যিই একদিন বাংলাদেশের খেলা ফিফা বিশ্বকাপে দেখতে পারব?আব্বু একটুও দেরি না করে বললেন,হ্যাঁ, অবশ্যই পারবে। হয়তো এবার না, কিন্তু একদিন অবশ্যই পারবে।তার কথার মধ্যে ছিল বিশ্বাস।আমি মনে মনে ছবি আঁকতে শুরু করলাম।একদিন বাংলাদেশও খেলবে সেই বড় মঞ্চে।লাল-সবুজ পতাকা উড়বে আকাশে। হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে থাকবে বাংলাদেশের নাম।তখন হয়তো স্কুলের বন্ধুদের আলোচনায় শুধু আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল থাকবে না। আর থাকলেও বাংলাদেশের ফুটবল দলের সামনে সেই আলোচনার রং কিছুটা ফিকে হয়ে যাবে।তখন হয়তো রোনালদো, মেসিদের চেয়ে একটু বেশি আপন মনে হবে নিজের দেশের খেলোয়াড়দের।আব্বুর মতো আমিও এখন স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি।কারণ আব্বুর কথা শুনে এখন সবকিছু পরিষ্কার।হয়তো কোনো এক গ্রামের মাঠে দৌড়াচ্ছে ভবিষ্যতের কেউ, যার পায়ে লুকিয়ে আছে আমাদের বিশ্বকাপের স্বপ্ন।হয়তো একদিন সত্যিই পূরণ হবে একজন বাবা আর ছেলের স্বপ্ন।সেই দিন হয়তো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের পতাকার চাইতে বেশি বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা।

লেখক:-

সাদমান সাকিব 

ডিগ্রি (বি.বি.এস)দ্বিতীয় বর্ষ

রাজশাহী কলেজ।

sadman11223355@gmail.com

৬১০০-সাগরপাড়া, ঘোড়ামারা, বোয়ালিয়া, রাজশাহী।


বাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৩ জুলাই ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শনিবার , ০৪ জুলাই ২০২৬
হোমমতামতবাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ

বাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ

favicon
সাদমান সাকিব :
বাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ

আমার সকাল শুরু হয় কোনো অ্যালার্মের শব্দে নয়, শুরু হয় আব্বুর কণ্ঠে।ঘুমের ঘোরে যখন পুরো পৃথিবীটা নীরব থাকে, তখন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে পত্রিকার পাতার শব্দ আর আব্বুর জোরে জোরে পড়ার আওয়াজ।অনেক মানুষই পত্রিকা পড়ে। কিন্তু আব্বুর পত্রিকা পড়ার ধরনটা একটু আলাদা। কেউ হয়তো চুপচাপ চোখ বুলিয়ে খবর পড়ে চলে যায়, কিন্তু আব্বু পত্রিকাকে শুধু পড়েন না, তিনি যেন সেটাকে অনুভব করেন।চশমাটা নাকের সামনের অংশে নামিয়ে, খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটা খবর পড়েন। কখনো কোনো খবরের কাছে একটু থেমে যান, কখনো আবার নিজের মতো করে প্রতিক্রিয়াও দেন।রাজনীতির খবর পড়ার সময় মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে একটা আফসোস শুনতে পাই। আমি অপেক্ষা করে থাকি, কখন তিনি পত্রিকার খেলাধুলার পাতায় যাবেন।খেলাধুলার খবর পড়ার সময় আব্বুর চোখেমুখে একটা আলাদা আনন্দ দেখতে পাই। আর আমিও তখন অদ্ভুত এক ভালো লাগা অনুভব করি।আব্বুর মুখে প্রায়ই একটা কথা শুনি। হঠাৎ করেই বলে ওঠেন,আমার বাংলাদেশ একদিন ফিফা বিশ্বকাপ খেলবে।আব্বুর এই কথাটা যে শুধু একটা স্বপ্ন নয়, সেটা আমি বুঝতে পারতাম। তার কণ্ঠে একটা বিশ্বাস ছিল।আব্বুর সবচেয়ে পছন্দের খেলা ফুটবল। কারণ যে মানুষ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগার মতো যে সব লিগ আছে সেসবের ম্যাচগুলো মিস করতে চান না, তিনি যে একজন ফুটবলপ্রেমী মানুষ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।আর ফিফা বিশ্বকাপ এলে সেটা আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। যত কাজই থাকুক, সব দ্রুত শেষ করে টেলিভিশনের সামনে বসে যান। দায়িত্বশীল একজন মানুষ থেকে এক মুহূর্তে তিনি যেন হয়ে যান ছোট্ট এক শিশু। টেলিভিশনের স্ক্রিনের মাঝেই হারিয়ে যান।দুই বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার পা এমনভাবে ভেঙে যায়, যেন জীবনটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল।পরে অপারেশনের মাধ্যমে সেটি ঠিক করা হয়। ডাক্তাররা বলেছিলেন ভাঙা হাড় আবার জোড়া লাগাতে হবে। প্লেট আর স্ক্রুর মাধ্যমে সেটি ঠিক করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে বলা হয় ওপেন রিডাকশন ইন্টারনাল ফিক্সেশন।ডাক্তার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, দৌড়ানো, খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আগের মতো বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা, সবকিছু থেকেই দূরে থাকতে হবে।তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, এটা শুধু সাময়িক সমস্যা নয়। এটা এমন একটা সীমা, যেটা আর আগের মতো পার হওয়া সম্ভব নয়।হাঁটতে পারি ঠিকই, কিন্তু সেটা আর আগের মতো স্বাভাবিক হাঁটা নয়। এটা এখন সাবধানে চলার হাঁটা।সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হলো, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ানোর ইচ্ছাটা এখনো আছে। কিন্তু শরীর মনে করিয়ে দেয়, আমি আর আগের জায়গায় নেই।এখন আমি এটাকে মেনে নিয়েছি। হয়তো সারাজীবন এভাবেই চলতে হবে। ধীরে ধীরে, হিসেব করে। নিজের সঙ্গে একটা নীরব সমঝোতার মধ্য দিয়ে।কিন্তু তাহলে আব্বুর দেখা সেই স্বপ্নের কী হবে?আব্বুর পত্রিকা খুলে খেলাধুলার পাতায় কি শুধুই ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল তারকাদের খবর থাকবে?ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, মেসি, নেইমারদের খবরেই কি সব পাতা ভরে থাকবে?আমাদের দেশের ছেলেদের খবর কোথায়?হাজারো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।এসব প্রশ্ন নিয়ে স্কুলে গিয়ে দেখি, ফিফা বিশ্বকাপের মৌসুম চলছে। স্কুলে বন্ধুদের আলোচনার বিষয় শুধুই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল।দুই একটা জার্মানির সমর্থকও ছিল। কিন্তু খেয়াল করতাম, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থক তাদের সঙ্গে তর্কে যেতে চাইত না।তবে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আর সমালোচনা চলত।এভাবেই সব ক্লাস শেষ হলো। স্কুল থেকে বাসায় ফিরলাম।আমি আর এক মুহূর্ত দেরি করলাম না। ছুটে গেলাম আব্বুর কাছে।বললাম,সবাই শুধু আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল নিয়ে মাথা শেষ করছে। বাংলাদেশ কবে ফিফা বিশ্বকাপ খেলবে আব্বু?আমার প্রশ্নটা যেন হঠাৎ করেই ঘরের নীরবতা কেটে দিল।আব্বু তখন চা শেষ করে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। দিনের ক্লান্তিটা শরীর থেকে একটু একটু করে নামছিল।আমার কথা শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শান্তভাবে আমার দিকে তাকালেন।আমি যেন থামতেই পারছিলাম না। এতদিনের জমে থাকা প্রশ্নগুলো একের পর এক বেরিয়ে আসছিল।আব্বু বুঝলেন, শুধু উত্তর দিলে হবে না, আমাকে বিশ্বাস করাতে হবে।তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,অবশ্যই বাংলাদেশ একদিন ফিফা বিশ্বকাপ খেলবে।তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না। ছিল এক ধরনের দৃঢ় বিশ্বাস।তারপর তিনি বাংলাদেশের কয়েকজন ফুটবলারের কথা বলতে শুরু করলেন। বললেন, আমাদের দেশেও প্রতিভার অভাব নেই। শুধু দরকার সঠিক সুযোগ, পরিচর্যা আর সময়।তিনি হামজা চৌধুরীর কথা বললেন, যিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলেছেন এবং বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন আশা তৈরি করেছেন।বললেন জামাল ভূঁইয়ার কথা, যার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দীর্ঘদিন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।বললেন রাকিব হোসেনের কথাও। তার গতি, ড্রিবলিং আর খেলার ধরন নিয়ে আব্বুর চোখে একটা আলাদা আগ্রহ দেখেছিলাম।আরও অনেক খেলোয়াড়ের কথা বললেন। বললেন, হয়তো আজ না, কিন্তু কোনো একদিন এই দেশের ছেলেরাই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াবে।আমি চুপ করে শুনছিলাম।আর ভাবছিলাম, হয়তো আমি আমার এই পা নিয়ে আব্বুর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারব না।তবে মনে মনে বলছিলাম,তোমার স্বপ্ন আমি বুঝি আব্বু।বাংলাদেশকে ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে চাও তুমি।হয়তো একদিন তোমার সেই স্বপ্নের দলে থাকবে তোমারই ছেলে হয়ে কোনো এক সৈনিক।এই ভাবনাটা মনে হতেই ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছিলাম।এতদিন যে প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেগুলোর একটা উত্তর যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম।শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম,তাহলে আমরা কি সত্যিই একদিন বাংলাদেশের খেলা ফিফা বিশ্বকাপে দেখতে পারব?আব্বু একটুও দেরি না করে বললেন,হ্যাঁ, অবশ্যই পারবে। হয়তো এবার না, কিন্তু একদিন অবশ্যই পারবে।তার কথার মধ্যে ছিল বিশ্বাস।আমি মনে মনে ছবি আঁকতে শুরু করলাম।একদিন বাংলাদেশও খেলবে সেই বড় মঞ্চে।লাল-সবুজ পতাকা উড়বে আকাশে। হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে থাকবে বাংলাদেশের নাম।তখন হয়তো স্কুলের বন্ধুদের আলোচনায় শুধু আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল থাকবে না। আর থাকলেও বাংলাদেশের ফুটবল দলের সামনে সেই আলোচনার রং কিছুটা ফিকে হয়ে যাবে।তখন হয়তো রোনালদো, মেসিদের চেয়ে একটু বেশি আপন মনে হবে নিজের দেশের খেলোয়াড়দের।আব্বুর মতো আমিও এখন স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি।কারণ আব্বুর কথা শুনে এখন সবকিছু পরিষ্কার।হয়তো কোনো এক গ্রামের মাঠে দৌড়াচ্ছে ভবিষ্যতের কেউ, যার পায়ে লুকিয়ে আছে আমাদের বিশ্বকাপের স্বপ্ন।হয়তো একদিন সত্যিই পূরণ হবে একজন বাবা আর ছেলের স্বপ্ন।সেই দিন হয়তো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের পতাকার চাইতে বেশি বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা।

লেখক:-

সাদমান সাকিব 

ডিগ্রি (বি.বি.এস)দ্বিতীয় বর্ষ

রাজশাহী কলেজ।

sadman11223355@gmail.com

৬১০০-সাগরপাড়া, ঘোড়ামারা, বোয়ালিয়া, রাজশাহী।


বাবা-ছেলের সপ্নের ফুটবল বিশ্বকাপ
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৩ জুলাই ২০২৬