“লাশ নিয়ে ব্যবসা নয়” রাজশাহীতে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করছেন রবি
রাজশাহী মহানগরীতে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও বেদনাদায়ক মুহূর্ত-প্রিয়জন হারানোর সময়-শোকের ভারে ন্যুব্জ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সমাজসেবী রফিকুল ইসলাম রবির উদ্যোগে চালু হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যের অ্যাম্বুলেন্স সেবা। “লাশ নিয়ে ব্যবসা নয়”-এই মানবিক বার্তাকে সামনে রেখে নেওয়া এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।
জানা গেছে, এই সেবা চালুর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। আলোচনাগুলো ছিল অত্যন্ত আন্তরিক, যেখানে শোকাহত পরিবারের দুর্ভোগ কমিয়ে আনার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে একটি সমন্বিত ও মানবিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, যার ভিত্তিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় এই ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হবে। সংশ্লিষ্ট সকলেই এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম রবি বলেন, মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন কোনো সান্ত্বনাই যথেষ্ট মনে হয় না। প্রিয়জন হারানোর সেই শোকের মুহূর্তে যদি আর্থিক চাপ এসে যোগ হয়, তাহলে তা আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “আমি দেখেছি অনেক পরিবার লাশ পরিবহনের খরচ জোগাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই কষ্ট আমাকে নাড়া দিয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অন্তত শেষ যাত্রাটুকু যেন সম্মানের সঙ্গে, মানবিকতার সঙ্গে এবং বিনামূল্যে সম্পন্ন হয়। এটি কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগ কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি একটি সম্মিলিত মানবিক প্রয়াস। সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষ এগিয়ে এলে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করলে মানুষই তার পাশে দাঁড়ায়, আর সেই বিশ্বাস থেকেই এই উদ্যোগের পথচলা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, আলোচনায় অংশ নেওয়া অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও সংশ্লিষ্টরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা কাছ থেকে দেখেছেন শোকাহত পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব। অনেক সময় অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা বলেন, “আমরা চাই না কেউ তার প্রিয়জনের লাশ নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ুক। মানবিক জায়গা থেকেই আমরা এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছি। সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে রাজশাহী সিটিতে নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে সম্পূর্ণ ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।”
এ বিষয়ে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও মানবিক উদ্যোগ। সমাজে যখন নানা অনিয়ম ও অমানবিকতার অভিযোগ উঠে, তখন এমন উদ্যোগ মানুষকে আশাবাদী করে তোলে। আমরা আশা করি, এই সেবাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা এর সুফল পাবে।”
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মোঃ নুরে ইসলাম মিলন বলেন, “মানবিক মূল্যবোধ এখন সময়ের বড় প্রয়োজন। রফিকুল ইসলাম রবির এই উদ্যোগ শুধু একটি সেবা নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা। আমরা চাই, সমাজের অন্যান্য সামর্থ্যবান ব্যক্তিরাও এমন উদ্যোগে এগিয়ে আসুক এবং মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি আরও জোরদার হোক।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শুধুমাত্র একটি সেবামূলক কার্যক্রম নয়, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা। যেখানে মানবতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ একত্রিত হয়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। সমাজে যখন নানা অনিয়ম ও অমানবিকতার অভিযোগ উঠে, তখন এমন একটি উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো জ্বালায় এবং প্রমাণ করে-সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, এই ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়বে এবং সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমন মানবিক উদ্যোগ গড়ে উঠবে। অনেকেই মনে করছেন, এটি একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে, যা অন্যদেরও মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।
মানবিক নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় ক্ষমতায় নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়-এই সত্যকে সামনে রেখে রাজশাহী মহানগরীতে শুরু হতে যাওয়া এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে। মানুষের জন্য মানুষ-এই চেতনায় এগিয়ে চলুক সমাজ, মানবতার জয় হোক সর্বত্র।