বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল, নেই কার্যকর উদ্যোগ
প্রচলিত কথা রয়েছে, বিনা মেঘে বজ্রপাত। কিন্তু এখন আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এলেই অনেকের বুক কেঁপে ওঠে। এই বুঝি বজ্রপাত হয়। আকাশজুড়ে কালো মেঘের কোলছেঁড়া ফালি বিদ্যুতের আলোকচ্ছটায় চমকে ওঠে আকাশ। এটাই বিজলি চমক। এতে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে মন।
://dailyupochar.com/top-news/1432
দেশে বজ্রপাত এখন এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। একের পর এক বজ্রপাত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এক সময় বর্ষাকালে বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকত। আর এখন বছরজুড়েই বজ্রপাত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের প্রকোপে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চলতি বছরের চার মাসে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ ঝরে গেছে বজ্রপাতে। বজ্রপাতের বেশির ভাগ ঘটনাই গ্রামাঞ্চলের।
বজ্রপাতে অকাল মৃত্য ঠেকাতে কিংবা মানুষকে সচেতন করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর থেকে সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত বাড়ছে। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। চিঠিতে বজ্রপাতের সতর্কীকরণের জরুরি বার্তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। বিশেষ করে প্রতিটি মসজিদে প্রত্যেক শুক্রবার জুমার নামাজের আগে সুবিধাজনক সময়ে বজ্রপাতের সময় করণীয় বিষয়ে সতর্ক বার্তা প্রচারের অনুরোধ করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প অনুমোদন নিয়েও পরিকল্পনা কমিশন তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়নি। তবে পরিকল্পনা কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, তা সঠিক নয়। তবে ছোটখাটো প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলো হয়তো সেভাবে কাজে আসেনি।
আরো দেখুন:-
https://dailyupochar.com/top-news/1433
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বজ্রপাত নিরসনের সচেতনতা সম্পর্কে আলোচনা হয়। এমনকি বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এই শেড নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বজ্রমেঘ দেখলেই যেন কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। তবে এই ধরনের উদ্যোগ এখনও তেমন কার্যকর হয়নি।
জানা গেছে, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার জন্য টিআর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর জন্য ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এই বরাদ্দ করা টাকা দিয়ে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ৩৪৩টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে সব এলাকায় এই নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি জেলায় বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপনের জন্য ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর জন্য একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৯৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বজ্রপাতে এক যুগে ৩ হাজার ৪২৫ জন মারা গেছে। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৫ সালে ২২৬ , ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩০৭, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ১৫৮ , ২০২০ সালে ২৫৫, ২০২১ সালে ৩৬৩, ২০২২ সালে ৩৩৭, ২০২৩ সালে ৩৫০ ও ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ২৬৬ জন মারা গেছে বজ্রপাতে।কোন সময়ে বেশি বজ্রপাত হয় এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, হাওড়ের জলীয় বাষ্প, পাহাড়ের বাধা ও ভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষে সিলেট ও আশপাশের এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি। জলীয় বাষ্পসমৃদ্ধ এলাকার আশপাশেই বজ্রপাত বেশি হয়। দেশে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। জেলার মধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
গত এক দশকে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এই উপজেলায়। এর বাইরে নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙামাটি, পটুয়াখালী, খেপুপাড়াসহ আরও কিছু এলাকায় তুলানমূলকভাবে বেশি বজ্রপাত হয়। মূলত ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেটে বজ্রপাত বেশি হয়।
আরেক আবাহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, দেশের ৩৮ শতাংশ বজ্রসহ ঝড় হয় মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার তথ্য বলছে, সারা বিশ্বে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জসহ নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে।
বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য ২০১৮ সালে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন জেলায় ২ লাখেরও বেশি তালগাছ রোপণ করা হয়। কিন্তু এখন সেসব গাছের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কষ্টকর।
বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের কৃষিবিদ দিলীপ সেন জানান, তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক বজ্রপাত থেকে রক্ষায় সহায়ক বলে মনে করা হয়। তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাতের নিরোধে সহায়তা করে। তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকে। এ কারণে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় তালগাছ রোপণে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে করণীয় সম্পর্কে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলা মাঠে যদি কেউ থাকেন তা হলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে আর কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। আবার বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।
ভবনের ছাদে বা উঁচু ভূমিতে যাওয়া ঠিক হবে না। খালি জায়গায় যদি উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব পদার্থ বা মোবাইল টাওয়ার থাকে তার কাছাকাছি থাকা যাবে না। বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়াই উচিত হবে।
সমুদ্রে বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। যদি গাড়ির ভেতরে থাকে তবে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ রাখা যাবে না। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। বজ্রপাতের সময় অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক বন্ধ রাখা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন রাখা নিরাপদ।