শনিবার , ২৫ জুলাই ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

ঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :-
ঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ‘বড়কুঠি’কে ঘিরে আবারও মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এর কর্তৃত্ব নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইতিহাসবিদ, সংস্কৃতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করছেন, ভবনটিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে পরিচালনা করা হলে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রাজশাহীর সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা ভবনগুলোর অন্যতম। গবেষকদের ধারণা, অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে ডাচ (ওলন্দাজ) বণিকরা রেশম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য সংরক্ষণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং আবাসনের উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে ভবনটির মালিকানা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে যায়।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে রেশম শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশের সময় বিভিন্ন স্থানে কুঠি বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। বড়কুঠি ছিল সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভবনটি শুধু বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেই ব্যবহৃত হয়নি; নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় এটিকে অনেকটা দুর্গের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল বলেও গবেষকদের ধারণা। ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা টাওয়ারের উপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অস্ত্র ও কামান উদ্ধারের ঘটনাও সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।

স্থাপত্যগত দিক থেকে বড়কুঠি একটি ১২ কক্ষবিশিষ্ট দ্বিতল ভবন। প্রায় ৮২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬৭ ফুট প্রস্থের এই ভবনের নিচতলায় ছয়টি এবং ওপরতলায় ছয়টি কক্ষ রয়েছে। ধারণা করা হয়, ওপরের তলার কক্ষগুলো আবাসিক কাজে এবং নিচতলার কক্ষগুলো পণ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় ভবনটি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে গেলেও পরে ব্রিটিশরা পুনরায় দখল নেয়। এরপর এটি ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে গিয়ে এটি ব্যবসায়িক ও আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হয়।

দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে বড়কুঠি সরকারি খাস সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কিছু সময় খাদ্য বিভাগের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের পর ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এটি উপাচার্যের বাসভবন, প্রশাসনিক কার্যালয়, শিক্ষক ক্লাব এবং কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক পর বড়কুঠিকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলে এর সংরক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে আসে। ভবনটির সংস্কার, সংরক্ষণ এবং একটি সিটি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।

সম্প্রতি বড়কুঠির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভবনটি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ফিরিয়ে আনার আগ্রহের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনায় এসেছে। যদিও সরকারি সম্পদের মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংস্কৃতিবিদদের মতে, বড়কুঠির মতো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মূল গুরুত্ব এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য। তাই ভবনটিকে ক্লাব বা সাধারণ প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার না করে গবেষণা, সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, বড়কুঠিকে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে পরিচালনা করা হলে একদিকে যেমন এর যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে রাজশাহীর ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও পর্যটনের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।

ঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৪ জুলাই ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শনিবার , ২৫ জুলাই ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

ঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :-
ঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ‘বড়কুঠি’কে ঘিরে আবারও মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এর কর্তৃত্ব নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইতিহাসবিদ, সংস্কৃতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করছেন, ভবনটিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে পরিচালনা করা হলে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রাজশাহীর সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা ভবনগুলোর অন্যতম। গবেষকদের ধারণা, অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে ডাচ (ওলন্দাজ) বণিকরা রেশম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য সংরক্ষণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং আবাসনের উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে ভবনটির মালিকানা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে যায়।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে রেশম শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশের সময় বিভিন্ন স্থানে কুঠি বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। বড়কুঠি ছিল সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভবনটি শুধু বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেই ব্যবহৃত হয়নি; নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় এটিকে অনেকটা দুর্গের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল বলেও গবেষকদের ধারণা। ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা টাওয়ারের উপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অস্ত্র ও কামান উদ্ধারের ঘটনাও সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।

স্থাপত্যগত দিক থেকে বড়কুঠি একটি ১২ কক্ষবিশিষ্ট দ্বিতল ভবন। প্রায় ৮২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬৭ ফুট প্রস্থের এই ভবনের নিচতলায় ছয়টি এবং ওপরতলায় ছয়টি কক্ষ রয়েছে। ধারণা করা হয়, ওপরের তলার কক্ষগুলো আবাসিক কাজে এবং নিচতলার কক্ষগুলো পণ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় ভবনটি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে গেলেও পরে ব্রিটিশরা পুনরায় দখল নেয়। এরপর এটি ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে গিয়ে এটি ব্যবসায়িক ও আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হয়।

দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে বড়কুঠি সরকারি খাস সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কিছু সময় খাদ্য বিভাগের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের পর ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এটি উপাচার্যের বাসভবন, প্রশাসনিক কার্যালয়, শিক্ষক ক্লাব এবং কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক পর বড়কুঠিকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলে এর সংরক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে আসে। ভবনটির সংস্কার, সংরক্ষণ এবং একটি সিটি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।

সম্প্রতি বড়কুঠির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভবনটি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ফিরিয়ে আনার আগ্রহের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনায় এসেছে। যদিও সরকারি সম্পদের মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংস্কৃতিবিদদের মতে, বড়কুঠির মতো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মূল গুরুত্ব এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য। তাই ভবনটিকে ক্লাব বা সাধারণ প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার না করে গবেষণা, সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, বড়কুঠিকে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে পরিচালনা করা হলে একদিকে যেমন এর যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে রাজশাহীর ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও পর্যটনের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।

ঐতিহ্যের বড়কুঠি কার হাতে? শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা নিয়ে নতুন টানাপোড়েন
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৪ জুলাই ২০২৬