৭ বছরের শিশুকে ২১ বছর দেখিয়ে মামলা, আদালতে জামিন
নাটোরের গুরুদাসপুরে ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে ২১ বছর দেখিয়ে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি করার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে আদালত শিশুটিকে জামিন দিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের উদবাড়িয়া গ্রামে। শিশুটির নাম হুসেন আলী। সে ওই গ্রামের শাহজাহান আলী ওরফে লিতাই কবিরাজের ছেলে এবং ৩৫ নম্বর ধারাবারিষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
জানা যায়, স্থানীয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্রাবণ সরকারের সঙ্গে কয়েকজন যুবকের পূর্ব বিরোধের জেরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় হুসেন আলীকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে তার বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
রোববার (২৬ এপ্রিল) দুপুরে হুসেনের পক্ষে আদালতে জামিন আবেদন করা হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম তার বয়স বিবেচনায় জামিন মঞ্জুর করেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ধারাবারিষা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে শ্রাবণ সরকার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় একদল যুবক তার ওপর হামলা চালায়। এতে সে আহত হয়। পরদিন তার বাবা শাহানুর রহমান ছেলে হুসেনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৩/৪ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন মাহফুজুর রহমান (১৯), তারেক রহমান (২০), মো. আলী (১৯) ও লালন কবিরাজ (৫০)।
এদিকে, জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী, হুসেন আলীর জন্ম ২০১৮ সালের ২৪ নভেম্বর। ফলে মামলায় উল্লেখিত বয়সের সঙ্গে তার প্রকৃত বয়সের বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে।
শিশুটির পরিবার জানায়, পূর্ব শত্রুতার জেরেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। মামলার বিষয়টি জানতে পেরে তারা দ্রুত আইনগত সহায়তা নেন এবং জামিনের আবেদন করেন।
হুসেনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩৫ নম্বর ধারাবারিষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী বলেন, “ঘটনার দিন ও সময়ে হুসেন শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছিল। রুটিন অনুযায়ী ক্লাস চলছিল, তাই বিদ্যালয় ত্যাগ করার কোনো সুযোগ ছিল না। এ বিষয়ে আদালতে প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে।”
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম বলেন, “বাদীর দেওয়া এজাহারের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হুসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম হোসেন প্রামাণিক জানান, আদালত শিশুটির বয়স বিবেচনায় জামিন মঞ্জুর করেছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে কেন ৭ বছরের শিশুকে ২১ বছর দেখিয়ে আসামি করা হলো, তা জানতে বাদীর প্রতি নোটিশ জারি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আসামির বয়স সম্পর্কে জানতে চাইলে বাদী প্রথমে ২১, পরে ১৫ বছর বলেন। কিন্তু প্রকৃত বয়স ৭ জানানো হলে তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে ফোন কেটে দেন।”
তবে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মামলার বাদী শাহানুর রহমানের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
হুসেনের বাবা শাহজাহান আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছোট বাচ্চা খুব ভয় পেয়ে গেছে। আমি আমার সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার চাই। যারা তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে, তাদের বিচার হওয়া দরকার।”
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট বাকী বিল্লাহ রশীদি বলেন, “মাত্র সাত বছর বয়সে একটি শিশুকে আদালতে এসে নিজের জামিনের জন্য ওকালতনামায় স্বাক্ষর করতে হয়েছে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এমন ঘটনা শিশুটির মানসিকতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিহিংসাবশত এ ধরনের কাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”