রাজশাহীতে জেন্ডার, বৈচিত্র্য ও মানবাধিকার বিষয়ক দুই দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত
সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং সর্বস্তরে মানবাধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে রাজশাহীতে শেষ হলো দুই দিনব্যাপী ‘জেন্ডার, বৈচিত্র্য ও মানবাধিকার’ বিষয়ক বিশেষ কর্মশালা। বিশিষ্ট উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক)-এর উদ্যোগে রাজশাহী আঞ্চলিক রিসোর্স সেন্টারের সেমিনার কক্ষে এই নিবিড় প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সমাপনী দিনে বিশেষজ্ঞ আলোচকবৃন্দ জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবার কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জোরালো তাগিদ দেন।
কর্মশালার প্রথম দিনে জেন্ডার ধারণা, লৈঙ্গিক বৈষম্য ও সামাজিক বৈচিত্র্য বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রেক্ষিত তুলে ধরেন বারসিকের এগ্রোইকোলজি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ্বাস। দ্বিতীয় ও সমাপনী দিনে আলোচনায় অংশ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী রবিউল আলম এবং বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক শহিদুল ইসলাম মানবাধিকার ও অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন রূপরেখা নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
আলোচকরা বলেন, সমাজে প্রকৃত অর্থে সাম্য আনতে হলে কেবল সাংবিধানিক বা নীতিগত ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, বরং পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর ঘটাতে হবে। কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর কেবল সংখ্যাগত উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও মতামতের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সম্পদ বণ্টনে পূর্ণ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। পাশাপাশি বয়স, জাতিগত সত্ত্বা, শারীরিক সক্ষমতা বা আর্থসামাজিক অবস্থানের ভিন্নতার কারণে যেন কোনো নাগরিক মৌলিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন না হন, সে বিষয়ে নীতি-নির্ধারকদের কার্যকর নজরদারি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।
বিশেষত কৃষিভিত্তিক সমাজ ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রেক্ষাপট টেনে বক্তারা উল্লেখ করেন, বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশে স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, ঐতিহ্যবাহী কৃষিচর্চা এবং পরিবেশবান্ধব এগ্রোইকোলজি রূপরেখায় গ্রামীণ নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের এই দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের জ্ঞান ও নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তিতে ন্যায্যতা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য বাজার নিশ্চিতকরণে সম্মিলিত সহযোগিতার বিকল্প নেই।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জেন্ডার পলিসি বা নীতিমালা বাস্তবায়ন, সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন। যেকোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, মানবাধিকার কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি মানুষের জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। একটি মানবিক, প্রগতিশীল ও টেকসই সমাজ বিনির্মাণে জেন্ডার সমতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত রাখা সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।