তরুণদের মধ্যে প্রবণতা বৃদ্ধিতে বাড়ছে উদ্বেগ, পুলিশের সচেতনতার তাগিদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এমন চরম পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা পুলিশ ও সমাজ বিশ্লেষকরা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে জেলায় নথিভুক্ত ১৮১টি অপমৃত্যুর মধ্যে ৭০টিই ছিল আত্মহত্যার ঘটনা। উদ্বেগজনক এই বাস্তবতায় আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যায়ে মানসিক সহায়তা এবং সচেতনতা জোরদারের জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই তরুণ সমাজের প্রতিনিধি। মোট ৭০ জনের মধ্যে ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৯ জন। এছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরী রয়েছে ১৫ জন। মধ্যবয়সী নাগরিকদের মধ্যে ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১২ জন এবং ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়সসীমার ৯ জন রয়েছেন। এছাড়া ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা ৫ জন। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেলেও জীবনের প্রারম্ভে থাকা তরুণ সমাজই সবচেয়ে বেশি মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসন ও সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আত্মহত্যার নেপথ্যে বহুমুখী পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক সংকট সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তরুণদের ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত জটিলতা, পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফলের অভাব, তীব্র ক্ষোভ-অভিমান, ভার্চ্যুয়াল নিঃসঙ্গতা এবং পরিবারের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অশান্তি, সামাজিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার চাপ বহু নারীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, ঋণের বোঝা এবং জীবিকা নির্বাহের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মারাত্মক মানসিক অবসাদ ডেকে আনছে। প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা ও বিশেষজ্ঞ সহায়তার অভাবে এসব মানসিক চাপ একপর্যায়ে আত্মহননের রূপ নিচ্ছে।
একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে চরম সহিংসতা ও পরবর্তীকালে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও জেলার সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার রসিকনগর গ্রামে পারিবারিক কলহের জেরে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি কর্তৃক স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যার পর নিজের আত্মহননের মর্মান্তিক নজির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মনাকষা ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নেও কলহের জেরে অনুরূপ হিংস্র ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যা দাম্পত্য সংকট নিরসনে সামাজিক সালিশ, পেশাদার কাউন্সেলিং ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের আবশ্যকতা তুলে ধরেছে।
পরিস্থিতি উত্তরণে প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস। তিনি জানান, সাময়িক মানসিক বিভ্রান্তি বা হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে একটি অমূল্য প্রাণের অপচয় রোধ করতে হলে পরিবারকে প্রথম দুর্গের ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্যের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, হতাশা বা নিঃসঙ্গতার লক্ষণ প্রকাশ পেলে বকাঝকা বা দোষারোপ না করে সহমর্মিতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ফলের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন না করে সন্তানদের আবেগ ও মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং কার্যক্রম চালু রাখা জরুরি।
পুলিশ সুপার আরও উল্লেখ করেন, সংকটগ্রস্ত মানুষকে সামাজিকভাবে হেয় না করে সঠিক সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রশাসনের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়; এজন্য প্রতিটি পরিবার, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত মানবিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সংকটাপন্ন মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে অবহেলা না করে সময়মতো সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকানোর একমাত্র কার্যকর উপায়।