১৫৭ কন্যার অভিভাবক সিরাজগঞ্জের মানবিক মামুন বিশ্বাস
রক্তের সরাসরি কোনো উত্তরাধিকার নেই, নেই পারিবারিক আত্মীয়তার চেনা বন্ধনও। অথচ জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত ও স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে তিনি দাঁড়িয়েছেন পরম নির্ভরতা হয়ে-কখনো স্নেহময় বাবা, কখনো দায়িত্বশীল ভাই, আবার কখনো বটবৃক্ষের মতো এক অভিভাবক হিসেবে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার আগনুকালি গ্রামের সন্তান সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এক অসাধারণ সামাজিক দায়িত্ব। অর্থের নির্মম সংকটে যেসমস্ত তরুণীর বিয়ের স্বপ্ন বারবার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, তাদের জীবনে তিনি খুলে দিয়েছেন নতুন আশার দুয়ার। বর-কনের পোশাক, অলংকার, বিয়ের প্যান্ডেল, খাবার ও সামাজিক মর্যাদা-সবকিছুর সুচারু ব্যবস্থাপনা করে স্থানীয় জনপদে তিনি আজ পরিচিতি পেয়েছেন ‘১৫৭ কন্যার পিতা’ হিসেবে।
শাহজাদপুরের স্কুলশিক্ষক মাহবুবুল হোসেনের ছেলে মামুনের এই মানবিক অভিযাত্রার পেছনে রয়েছে এক গভীর সংবেদনশীল ইতিহাস। স্থানীয় ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সিরাজগঞ্জের খুকনী গ্রামের একটি চা দোকানে ফেরদৌস নামের এক বাক্প্রতিবন্ধী শিশুকে সমবয়সীদের হাতে নিগৃহীত হতে দেখে ভীষণভাবে ব্যথিত হন মামুন। সেই রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবন্ধী শিশুদের সুরক্ষায় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন তিনি। শুরুতে সমাজের নানা মহলের কটু কথা ও উপহাসের মুখে পড়লেও স্কুলশিক্ষক বাবার অটুট সমর্থনে তিনি পিছপা হননি। সেই থেকে শুরু হওয়া পথচলা আজ এক বিশাল মানবিক মহীরুহে রূপ নিয়েছে।
অসহায় পরিবারের কন্যাদায়গ্রস্ততার খবর পেলেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান মামুন। ধর্ম-বর্ণের সীমারেখা পেরিয়ে মুসলিম, সনাতন ধর্মাবলম্বী কিংবা বাক্প্রতিবন্ধী-যেখানেই বিপন্নতা, সেখানেই পৌঁছে যায় তার সহযোগিতার হাত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে দেশ-বিদেশের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন তিনি। যমুনার দুর্গম বালুচর থেকে প্রত্যন্ত জনপদে প্রতিটি অর্থ সরাসরি পৌঁছে দেন প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে।
সম্প্রতি কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঘরি গ্রামের আতিয়া খাতুনের জীবনে নেমে এসেছিল তেমনই এক অলৌকিক পরিবর্তন। বাবা দীর্ঘদিনের অসুস্থ ও কর্মহীন, মা অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করে কোনোমতে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। চরম আর্থিক সংকটে এর আগে দুইবার বিয়ে ঠিক হয়েও ভেঙে যায় আতিয়ার। বিষয়টি মামুনের নজরে আসার পর ফেসবুকে ডাক দিলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় তিন লাখ টাকার মানবিক সহায়তা সংগৃহীত হয়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাঁকজমকপূর্ণ আবহে মেহেন্দিরাঙা হাতে সম্পন্ন হয় আতিয়ার বিয়ে, বহুদিনের দুঃসহ কান্নার সমাপ্তি ঘটে স্বস্তির হাসিতে।
একই উপজেলার জামতৈল গ্রামের ভূমিহীন পরিবারের কন্যা সুচিত্রা রানী দাসের ভাগ্যও বন্দি ছিল একই রকম নির্মম পরিহাসে। ভাড়া বাসায় দিনমজুরি করে চলা পরিবারে তিন বেলা আহার জোগাড় করাই যখন দুর্বিষহ, তখন তিন দফা বিয়ে ভেঙে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল পুরো পরিবার। মামুন বিশ্বাসের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাঁচ দিনে জমা পড়ে প্রায় দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা। গত ১ অক্টোবর ধর্মীয় রীতি মেনে পলাশ কুমার ভৌমিকের সঙ্গে সুচিত্রার বিয়ের পূর্ণ আয়োজন সম্পন্ন করা হয় এবং তার মায়ের হাতে পুনর্বাসনের জন্য নগদ ২১ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয়।
উল্লাপাড়ার বড়হর ইউনিয়নের ধুনচি গ্রামের পিতৃহীন নন্দিনীর লড়াইটি ছিল আরও হৃদয়বিদারক। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারানো নন্দিনী ও তার বোন প্রতিবেশীদের পুরোনো কাপড় গায়ে জড়িয়ে বড় হয়েছেন। মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করার পাশাপাশি বাঁশের কুলা তৈরি করে কোনোমতে দিন পার করতেন। যৌতুক ও অর্থসংকটে নন্দিনীর বিয়ের আলোচনা ভেঙেছিল একে একে ছয়বার। ভাগ্যের কাছে প্রায় হার মেনে নেওয়া সেই নন্দিনীর পাশে দাঁড়িয়ে মামুন সংগ্রহ করেন প্রায় দুই লাখ ১২ হাজার টাকা, যার মাধ্যমে অবসান ঘটে দীর্ঘ লাঞ্ছনার।
জাতীয় তাঁতী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুস ছামাদ খানের মতে, সদিচ্ছা ও নির্মোহ নিষ্ঠা থাকলে সমাজকে যে কতটা ইতিবাচকভাবে বদলে দেওয়া যায়, মামুন বিশ্বাস তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত। কন্যাদের বিয়ে দেওয়া ছাড়াও অসহায়দের গৃহনির্মাণ, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, গৃহপালিত পশু ও ক্ষুদ্র ব্যবসার দোকান করে দিয়ে শত শত পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছেন তিনি। নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন পক্ষীকূলের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম।
বিপুল এই কর্মযজ্ঞের মাঝেও নিজেকে প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখেন এই সমাজকর্মী। মামুন বিশ্বাসের ভাষ্যমতে, এই ১৫৭টি বিয়ে ও সামগ্রিক মানবিক উদ্যোগের প্রকৃত রূপকার দেশ-বিদেশের সেই অসংখ্য মানবিক মানুষ, যারা দূর থেকে বিশ্বাস রেখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রতিটি বিয়ের পেছনে লুকানো থাকে একটি পরিবারের কান্না, অনিশ্চয়তা আর স্বস্তির নিঃশ্বাস; সেই কান্নাটুকু মুছে মানুষের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোই তার জীবনের একমাত্র পরম চাওয়া।