রাজশাহীতে সার ডিলার নিয়োগে কোটি টাকার সিন্ডিকেট বাণিজ্য
কৃষি খাতের অতি-স্পর্শকাতর রাসায়নিক সার বণ্টনব্যবস্থা কুক্ষিগত করতে রাজশাহীতে নজিরবিহীন অপরাধমূলক জালিয়াতি ও কোটি টাকার গোপন বাণিজ্যের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। যোগ্য ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণভাবে ছাঁটাই করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বজন ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ডিলারশিপ হাতিয়ে নেওয়ার পুরো ছক এখন প্রকাশ্যে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক সম্প্রতি অনুমোদিত তালিকার গোপন নথি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে চিহ্নিত হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সেই সব সুবিধাভোগী ডিলার ও তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মাধ্যমে সাজানো তালিকায় সংকেতপূর্ণ টিকচিহ্ন দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ব্যক্তিদেরই চূড়ান্ত লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এর নেপথ্যে প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অনুমোদিত নথিপত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগই পরিচালিত হচ্ছে রাজনৈতিক পদধারীদের স্ত্রী, সন্তান কিংবা পরিবারের সদস্যদের নামে।
উপজেলাওয়ারী অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ডিলার ও তাদের নেপথ্যের পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, চারঘাট সদর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে মেসার্স আলিফ ট্রেডার্স, যার নেপথ্যে রয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেন এবং লাইসেন্সটি নেওয়া হয়েছে তাঁর স্ত্রী জিনিয়া পারভিনের নামে। সরদহ ইউনিয়নে বরাদ্দ পাওয়া মেসার্স অথৈয় অ্যান্ড আরিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইসরাত জাহান হলেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী। নিমপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স দুর্জয় ট্রেডার্সের মাধ্যমে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নিজে। ইউসুফপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ হাতিয়ে নিয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা।
বাঘা উপজেলার চিত্রও একই সিন্ডিকেটের দখলে। মনিগ্রাম ইউনিয়নে লাইসেন্স পেয়েছে মেসার্স রুবেল ট্রেডার্স, যার মালিক জেলা বিপ্লবী দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল আলী। পাকুড়িয়া ইউনিয়নে বরাদ্দ পাওয়া মেসার্স জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়ারুল হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সদস্য। বাউসা ইউনিয়নে মেসার্স আতিক ট্রেডার্সের নামে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন পলাশের স্ত্রী জোবাইদা খাতুন। গড়গড়ি ইউনিয়নে মেসার্স রুহি এন্টারপ্রাইজের মালিক হিসেবে লাইসেন্স পেয়েছেন ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মমিন। আড়ানী পৌরসভায় মেসার্স আসাদুজ্জামান ডিলারশিপ পেয়েছে ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আসাদুজ্জামানের নামে এবং বাঘা পৌরসভায় লাইসেন্স পেয়েছে উপজেলা জিয়া পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি শফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন মেসার্স সাদি এন্টারপ্রাইজ।
তানোর উপজেলায় সিন্ডিকেটের বিস্তার আরও গভীর। তানোর পৌরসভায় লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছে পৌর যুবদলের আহ্বায়ক এমদাদুল হক মণ্ডলের মেসার্স মণ্ডল এন্টারপ্রাইজ। মুণ্ডুমালা পৌরসভায় মেসার্স বন্ধন এন্টারপ্রাইজের নামে লাইসেন্স পেয়েছেন পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কবিরের ভাই ফরহাদ কবির। কলমা ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত শীষ মোহাম্মদের ছেলে তানভীর আহমেদ ডিলার হয়েছেন। পাঁচন্দর ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম মোর্তুজার স্ত্রী উম্মুল মোমেনিন খানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স অহনা ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে। সরনজাই ইউনিয়নে মেসার্স শাহনেওয়াজ ট্রেডার্স পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে শাহনেওয়াজের নামে। চাঁন্দুড়িয়ায় মেসার্স হাজী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আলাউদ্দিন হলেন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। বাঁধাইড় ইউনিয়নে মেসার্স মর্জিনা এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে উপজেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মামুনুর রশিদের স্ত্রী সিদ্দিকা তামান্নার নামে। কামারগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স রাদিয়া এগ্রোর মালিক হিসেবে লাইসেন্স পেয়েছেন উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব শরিফ উদ্দিন এবং তালন্দ ইউনিয়নে মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক হয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল হান্নানের ছেলে ওমর ফারুক।
পুঠিয়া উপজেলায় বেলপুকুর ইউনিয়নের মেসার্স আহসান ট্রেডার্সের মালিক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আহসান হাবীব। শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে উপজেলা বিএনপির সদস্য খাদেমুল ইসলামের নামে। পুঠিয়া সদরে মেসার্স হিমেল ট্রেডার্স পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রিসাব হোসেন কেতাবের নামে। জিউপাড়ায় মেসার্স সাঈদ ট্রেডার্সের মালিক ইউনিয়ন কৃষকদলের সদস্য সচিব মাহাবুর রহমান এবং বানেশ্বরে মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজের মালিক উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব জাকির হোসেন রাসেল। অন্যদিকে পুঠিয়া পৌরসভায় মেসার্স ফারিশ ট্রেডার্সের মাধ্যমে ডিলার করা হয়েছে রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতজামাই সাহেদ হাসানকে।
একইভাবে মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নে মেসার্স শাপলা ট্রেডার্সের মালিক হয়েছেন বিএনপি সভাপতি আব্দুল মালেকের ছেলে উমর ফারুক। পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে মেসার্স ইপ্তি এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে নাঈম ওয়াসিফের নামে এবং হরিয়ানে মেসার্স ট্রেডার্সের লাইসেন্স বাগিয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেনের ছেলে আতিকুর রহমান।
গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়ায় মেসার্স বিদ্যুৎ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক বেদার উদ্দিন বিদ্যুৎ। গোদাগাড়ী পৌরসভায় মেসার্স দুই ভাই ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহ হলেন জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মী। বাসুদেবপুর ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলমের ভাই মাইনুল। কাকনহাট পৌরসভায় লাইসেন্স পেয়েছেন পৌর বিএনপির সেক্রেটারি হাবিবুর রহমান। গোদাগাড়ী ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শামীম রেজা এবং রিশিকুলে ছাত্রদলের সভাপতি হোসেন আল মামুন ডিলারশিপ পেয়েছেন। দুর্গাপুরের ঝালুকায় লাইসেন্স পেয়েছে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান আয়নালের ছেলে ওয়ালিউজ্জামান রওনক, দুর্গাপুর পৌরসভায় জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক মেয়র সাইদুর মন্টুর ছেলে শাহ আলম সবুজ এবং জয়নগরে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জুবায়েদ হোসেনের ভাই সাইদুর রহমান।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যবসা পরিচালনার ন্যূনতম সক্ষমতা বা গুদাম না থাকা সত্ত্বেও এই চিহ্নিত ব্যক্তিদের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া হয়েছে মূলত সারের বাজার অস্থির করে বিপুল মুনাফা লুটের উদ্দেশ্যে। তবে অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ১৮ জন ডিলারের নিয়োগ প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে। এই কোটি টাকার গোপন বাণিজ্যের স্পষ্ট অভিযোগের পরও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং সদস্য সচিব উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন কোনো বক্তব্য না দিয়ে নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছেন।