চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার গ্রাসে সহস্রাধিক ভিটেমাটি
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর বিধ্বংসী ভাঙনে একের পর এক বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জেলা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং সীমান্তবর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, নামোজগন্নাথপুর, ফিল্ডেরহাট, কানছিরা, বোগলাউড়ি ও ঝাইলপাড়াসহ বিস্তীর্ণ জনপদে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক এই ভাঙনে ইতোমধ্যে সহস্রাধিক পরিবারের বসতভিটা পদ্মাগর্ভে হারিয়ে গেছে।
ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে এখন বিরাজ করছে তীব্র আতঙ্ক ও চরম মানবিক বিপর্যয়। নদীপাড়ের কোনো অংশে ভাঙন শুরু হওয়ামাত্রই স্থানীয় মসজিদের মাইক থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে। গভীর রাতে মাইকের ঘোষণা শুনে গ্রামবাসী দিকবিদিক ছুটে এসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি, গৃহপালিত পশু ও আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সহায়তা করছেন। গত চার থেকে পাঁচ বছরের ব্যবধানে নদীভাঙনের কবলে পড়ে অনেক পরিবারকে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত নিজেদের বাসস্থান বদলাতে হয়েছে। পৈতৃক ভিটেমাটি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া শত শত মানুষ এখন বাঁধের ঢালে কিংবা অন্যের জমিতে কোনোমতে মাথা গুঁজে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল জানিয়েছেন, পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে তাদের চার ইউনিয়নের ভৌগোলিক মানচিত্রই ওলটপালট হয়ে গেছে। বিশেষ করে পাঁকা ইউনিয়নের নিশিপাড়া, দক্ষিণ পাঁকা, ২০ রশিয়া, জ্যাকপাড়া ও দোভাগী এবং পার্শ্ববর্তী মনোহরপুর ও ফিল্ডেরহাট এলাকায় টানা ১০ দিন ধরে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। তার ইউনিয়নেই প্রায় ৫০০ পরিবারের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন। ফিল্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম ও সাদিকুল ইসলামসহ ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বহু মানুষের বসতভিটা চোখের পলকে নদীতে তলিয়ে গেছে; জরুরি ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করলে পুরো জনপদ নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
নদীভাঙনের কারণে বসতবাড়ির পাশাপাশি কয়েক হাজার একর উর্বর কৃষিজমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ফসলি জমি ভেঙে নদীগর্ভে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচরে। চলতি মৌসুমে পানি নেমে যাওয়ার পর প্রায় ৪ হাজার একর জমিতে গম, সরিষা ও ভুট্টা আবাদের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সর্বস্বান্ত কৃষকদের পক্ষে নতুন করে চাষাবাদের পুঁজি জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে বিনামূল্যে বা প্রণোদনা মূল্যে উন্নত বীজ ও সার সরবরাহের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
এদিকে স্থানীয় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ ও গতিপথে কৃত্রিম পরিবর্তন ঘটেছে। বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কার সবকটি জলকপাট হঠাৎ খুলে দেওয়ার পর পানির তীব্র চাপ ও পলি জমার বৈষম্যের কারণেই নিম্নাঞ্চলের তীরগুলোতে এমন অস্বাভাবিক ভাঙন দেখা দেয়। তবে পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর প্রাকৃতিক গতিপ্রকৃতির কারিগরি বিশ্লেষণ জরুরি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান মিশু জানান, পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন থেকে জনপদ ও কৃষিজমি রক্ষায় সরকার ৭৪৮ কোটি টাকার একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে। চলতি অর্থবছরেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি বাঁধ নির্মাণ ও নদীতীর সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়নের জোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পদ্মার বাম তীরের ১৬টি পয়েন্টে ১ হাজার ৯৪০ মিটার এবং ডান তীরের সাতটি পয়েন্টে ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ রক্ষা ও ব্লক ফেলার কাজ সম্পন্ন করা হবে।
পাউবোর প্রকৌশল বিভাগ নিশ্চিত করেছে, বর্তমানে দুর্লভপুরের মনোহরপুর, আইয়ুব বিশ্বাসের টোলা, নামোজগন্নাথপুর, ডাইলপাড়া, পাঁকার কানছিরা এবং সদর উপজেলার নারায়ণপুর চর, আলাতুলি, দেবীনগর ও হড়মা এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইতিপূর্বে সুন্দরপুর থেকে আলাতুলি পর্যন্ত বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হলেও নতুন ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি ক্লিনিক রক্ষায় জরুরি আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।