গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে: রিজভী
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট—সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরকে ঘিরে উত্তেজনা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি যুক্ত হওয়ায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রিজভী বলেন, এলএনজি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, শিল্পকারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পথও খুঁজতে হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত গ্যাস সংগ্রহের লক্ষ্যে মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের কাজও চলছে।
তবে সংকটের কারণে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন রিজভী। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু শুধু সংকটের কথা বলে জনগণকে উদ্বুদ্ধ না করে সমস্যার সমাধানে বাস্তবসম্মত প্রস্তাবও দেওয়া প্রয়োজন।
রিজভী বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা সরকারের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে কর্মসূচির নামে দীর্ঘ সময় সড়ক দখল করে রাখা কিংবা রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেন বিএনপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, গত ১৭ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন অনিয়মের যে প্রভাব তৈরি হয়েছে, তার কিছুটা বর্তমান সংকটেও পড়ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে এমন কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, যেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানার সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন রিজভী। তিনি বলেন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভীর ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্য পূরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করা জরুরি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। জাসাসের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, জাসাসের সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন, বিএনপির সহসাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদ সোহরাব, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু এবং গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক শামিমুর রহমান শামিম।