রাজশাহীতে ৪০ বছর পর উচ্ছেদের মুখে ৭৫০ পরিবার
রাজশাহী নগরীতে প্রায় চার দশক ধরে বসবাস করা প্রায় ৭৫০টি পরিবার হঠাৎ উচ্ছেদের মুখে পড়েছে। এতে পাঁচটি মহল্লার পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভূমিহীন সাইফুল ইসলাম, পেশায় রিকশাচালক। প্রায় ৪০ বছর আগে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ হিসেবে পরিচিত জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। তবে গত রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযানে তার ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
ভুক্তভোগীরা জানান, এতদিন তারা জানতেন জমিটি অর্পিত সম্পত্তি এবং কেউ কখনো মালিকানা দাবি করেননি। কিন্তু হঠাৎ আদালতের নির্দেশনার কথা বলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হয়। অনেকের অভিযোগ, তারা কোনো ধরনের নোটিশ পাননি।
নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের রায়পাড়া, বড়বনগ্রাম, চকপাড়া, ভাড়ালিপাড়া ও পাবনাপাড়া মহল্লায় এসব পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে বড়বনগ্রামে ৮টি, চকপাড়ায় ২৫টি এবং বাকি তিন মহল্লায় প্রায় সাত শতাধিক পরিবার রয়েছে। রোববার বড়বনগ্রামের ১৮ কাঠা জমিতে অভিযান চালিয়ে আটটি এবং পাবনাপাড়ায় ১৫টি বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রয়াত আবুল হাসেম ও মাইনুল হকের ওয়ারিশরা জমির মালিকানা দাবি করে আদালতের রায় অনুযায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তারা অ্যাডভোকেট কমিশন ও পুলিশ নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। তবে মহল্লাবাসীর দাবি, মামলায় তাদের বিবাদী করা হলেও এ বিষয়ে তারা আগে কিছুই জানতেন না।
জমির দাবিদার আজমল হক সাচ্চু জানান, ওই এলাকায় তাদের মোট ৭৬ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে ২০ বিঘা নিজেদের দখলে থাকলেও বাকি অংশ অর্পিত সম্পত্তি ও দখল হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৭ বিঘা জমি বুঝে পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং অবৈধ দখলে থাকা প্রায় ৪০ বিঘা জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ মামলা করা হয়েছে।
এদিকে উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় অ্যাডভোকেট কমিশনার নাসির আহমেদ হামলার শিকার হয়ে আহত হন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
উচ্ছেদের পর বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। অনেকে গরু-ছাগল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পাশের আমবাগানে আশ্রয় নিয়েছেন। বড়বন গ্রামের বাসিন্দা রিনা বেগম বলেন, রান্না শেষ করার আগেই ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অন্তঃসত্ত্বা আরেক রিনা বেগম প্রশ্ন তোলেন, “এই অবস্থায় আমি কোথায় যাব?”
পাবনাপাড়া এলাকার রুবি বেগম বলেন, “আমরা কি রোহিঙ্গা? আমাদের থাকার অধিকার নেই? দিনে ২০০ টাকা আয় করে খাওয়া-দাওয়া চালাই। এখন ঘর ভাড়া দেব কীভাবে? প্রয়োজনে জীবন দেব, তবুও জমি ছাড়ব না।”
স্থানীয় সমাজসেবক শামীম রায়হান বলেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া এতগুলো পরিবারকে উচ্ছেদ করা অমানবিক। তিনি বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন জানান, উচ্ছেদ অভিযানে জেলা প্রশাসনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্যও নেই। আদালতের কোনো নির্দেশনাও এখনো তাদের হাতে পৌঁছায়নি বলে তিনি জানান।