রাজশাহী,,

আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিনিধি : সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। বিশেষ করে পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সমাজে বাড়ছে অস্থিরতা। বাড়ছে হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে চুরি, ডাকাতি, নিখোঁজ, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। নিরাপদ আশ্রয়স্থল পরিবারও পরিণত হচ্ছে মৃত্যুকূপে। বাবা-মায়ের হাতে সন্তান খুন, সন্তানের হাতে জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রাণহানি, পরকীয়ায় জড়িয়ে স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন হওয়ার লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। ভাই খুন করছে ভাইকে।

অন্যদিকে, শিক্ষক, রাজনীতিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হচ্ছেন। এসব রহস্যেরও কোনো কূলকিনারা করতে ব্যর্থ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীরা এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, মানুষের নীতি-নৈতিকতার অবনতি, সামাজিক অবক্ষয়, অপ-রাজনীতি, বিচারহীনতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াসহ নানা কারণে এসব অপরাধ বাসা বেধেছে।

গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীসহ সারা দেশে অন্তত ১৭টি হত্যা ও লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীতে পরপর দুটি জোড়া খুন, বাড্ডায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র খুন এবং সর্বশেষ বনানীতে একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতেও গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দাবি করেছেন, দু-একটি ঘটনা দেখে বলা যায় না যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সার্বিক অর্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। অন্যদিকে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেই উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত হচ্ছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বনানীতে নিজ কার্যালয়ে সিদ্দিক মুন্সি (৫৫) নামে একজন জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক খুন হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো তিনজন। মাত্র আড়াই মিনিটে কিলিং মিশন শেষ করে সন্ত্রাসীরা। হত্যাকাণ্ডে চারজন খুনি সরাসরি অংশ নেয়। চারজনই মুখোশ পরা ছিলেন। তবে সিসি টিভির ফুটেজ থেকে খুনিদের শনাক্ত করে গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ২০০ লোককে বিদেশে পাঠানোর একটি কাজ পেয়েছিলেন নিহত সিদ্দিক মুন্সি। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছাড়াও পারিবারিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের নানা দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, বেশ কিছু তথ্য হাতে পেয়েছেন তারা। খুনিদের পেশাদার ও ভাড়াটে মনে করছে পুলিশ। জানা গেছে, নিহত এ ব্যবসায়ী দুই মাস আগে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছিলেন।

এদিকে, গত ৬ নভেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় নাসিম আহমেদ (২৪) এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র খুন হন। নিহত নাসিম বেসরকারি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। নয় মাস আগে তার বিয়ে হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজন কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত বুধবার রাত ৮টায় মানিকগঞ্জ শহরে একটি স্বর্ণের দোকানে ফিল্মি স্টাইলে ডাকাতি করে পালানোর পথে পুলিশের সঙ্গে ডাকাতদলের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশের দুই এসআই ও দুই কনস্টেবল আহত হয়েছেন এবং একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার, একটি পিস্তল ও কিছু স্বর্ণালংকারসহ এক ডাকাতকে আটক করে পুলিশ। সম্প্রতি রাজধানী থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও এক প্রকাশকসহ কমপক্ষে ছয়জন নিখোঁজ হয়েছেন। এসব নিখোঁজদের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত ১ নভেম্বর রাতে রাজধানীর কাকরাইলে নিজ বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয় মা শামসুন্নাহার ও ছেলে শাওনকে। পারিবারিক কলহ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। একই দিন রাতে বাড্ডায় বাবা জামিল হোসেন ও তার মেয়ে নুসরাত খুন হন। পরদিন সকালে বাবা-মেয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুটি ঘটনার পেছনে পরকীয়া, সম্পত্তির লোভ ও পারিবারিক কলহকে দায়ী করা হচ্ছে। এ দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ সারা দেশে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে তৈরি ইয়াবা ট্যাবলেট ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। বিপন্ন হচ্ছে পরিবারের শান্তি। সমাজে তৈরি করছে অস্থিরতা। স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কেও ফাটল ধরাচ্ছে। মাদকসেবীরা জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর সব অপরাধে। পারিবারিক অস্থিরতা, বিবাহবিচ্ছেদ ও সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। বাড়ছে হতাশা এবং আত্মহত্যার ঘটনা।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সামাজিক অবক্ষয় প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদা খাতুন বলেন, ‘দেশে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই বলে যে যার মতো কাজ করছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও একটা বড় সমস্যা। শাস্তি না হওয়ায় মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায় না।’ তিনি আরো বলেন, ‘অপরাধ করার আগে ভাবে আমার কিছু হবে না। আমার তো লোকজন আছে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক ভূমিকা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।’

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, পারিবারিক বা সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখাটা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবার বা সমাজের যারা অভিভাবক তাদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে পুলিশ তার সাধ্যানুযায়ী নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে এ ধরনের অপরাধের লাগাম টানার চেষ্টা করছে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে উঠান বৈঠকে এ ব্যাপারে জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, সন্তান ঘরের বাইরে বের হয়ে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, এ ব্যাপারে অভিভাবককে খোঁজ রাখতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অক্টোবরে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৪ নারী ও শিশু। তাদের মধ্যে শিশু ২৮ এবং ২৭ জন নারী। ১৭ জন নারী গণধর্ষণ ও দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। একই মাসে সারা দেশে ৬৭টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তাদের মধ্যে ১৭ পুরুষ, ৪৩ নারী ও শিশু সাতজন। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, অভিমান, রাগ ও যৌন হয়রানি, পরীক্ষায় খারাপ ফলের কারণে এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। অক্টোবরে ৩০ শিশুকে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে মা-বাবার হাতে নিহত হয় পাঁচজন। অক্টোবরে দেশে সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত হন ৮৬ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয় ২৬৪ জন, যার অধিকাংশ ঘটনা সরকারি দলের আন্তঃকলহে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে রাজধানীর বিভিন্ন হত্যাকান্ডের মধ্যে কমপক্ষে আটটি বাসার ভেতরে সংঘটিত হয়েছে। ওই আট হত্যাকান্ডে অন্তত ১৫ জন খুন হন। ঘটনার পর ‘বিশেষ’ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে, এখনো তদন্ত সংস্থার মামলা ফাইলেই আটকে আছে। কোনো কোনো মামলায় একাধিকবার তদন্ত সংস্থা বা তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। তার পরও বিচার তো দূরের কথা, জানা যায়নি কেন একজন মানুষ তার নিরাপদ আশ্রয় ঘরের মধ্যেই খুন হয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, মামলাগুলোর তদন্ত সঠিকভাবেই চলছে।

চাঞ্চল্যকর ১৫ হত্যাকাণ্ড : বাসার ভেতর খুনগুলোর মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী অন্যতম একটি ঘটনা হলো ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সংঘটিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা। একই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগের বাসায় স্কুলছাত্রী তাসনিম রহমান করবীকে শ্বাসরোধে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট দিনদুপুরে রামপুরার ওয়াপদা রোডের বাসায় গুলি করে হত্যা করা হয় সিআইডির অবসরপ্রাপ্ত এএসপি ফজলুল করিমকে।

২১ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার গোপীবাগে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় কথিত পীর লুৎফুর রহমান ফারুক, তার ছেলেসহ ছয়জনকে। পরের বছর ২৭ আগস্ট টেলিভিশনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী খুন হন পূর্ব রাজাবাজারে নিজের বাসায়। ২০১৫ সালের ১৩ মে পল্লবীতে নিজের ফ্ল্যাটে খুন হন গৃহবধূ সুইটি আক্তার ও তার মামা আমিনুল ইসলাম। একই বছরে বাসা থেকে উদ্ধার হয় আইনজীবী ফাহমিদা আক্তারের হাত-পা বাঁধা লাশ। গত বছর ১ নভেম্বর মগবাজারের মধুবাগে বাসার ভেতর গলা কেটে হত্যা করা হয় ডলি রানী বণিক নামের এক গৃহবধূকে।

Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



প্রকাশক ও সম্পাদক: ড. আবু ইউসুফ সেলিম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: নুরে ইসলাম মিলন
বার্তা সম্পাদক : ফাহমিদা আফরীণ
প্রধান প্রতিবেদক: এস.এম.আব্দুল কাজিম

মিয়াপাড়া কেজি স্কুলের উত্তরে, রাজশাহী।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোবাইল ০১৭১২-৭৮৭৯৮৫
বার্তা কক্ষ:- অফিস ০৭২১-৭৭২৬০৬
মোবাইল:- ০১৭১৯-৯৩২৮৯৯
Email : upochar.news@gmail.com
www.dailyupochar.com
https://www.facebook.com/pg/DailyUpochar

Design & Developed BY