,


সামাজিক আন্দোলনে দীর্ঘদিন নিয়োজিত থাকতে হবে রাজশাহীতে

“উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা শাখা) আবু আহাম্মদ আল মামুন”

এসপি হওয়ার সারে তিন বছর হলো, আরএমপি রাজশাহীতে পদোন্নতির পর থেকে আছি, দীর্ঘদিন নিয়োজিত থাকতে হবে রাজশাহী মহানগরবাসীর সেবায়। লোকে বলে ছোট ইউনিট, অনেক সিনিয়র অফিসার, কাজের ব্যস্ততা কম, অর্থহীন সময় কাটবে- তা মেনে নেয়া মানসিক যন্ত্রণার হবে।

২০১৬ সালে যোগদানের পর বের করলাম, কোথায় কোথায় যুব শ্রেণীর ট্রেনিং হয়-পেয়ে গেলাম আনসার কমান্ড্যান্ট কেমিকৌশলী বন্ধু, ও বলল, “তোর সময় কাটবে, ছাত্রছাত্রী নিয়ে যে প্রোগ্রাম (এসজিএপি) করিস; মাদক, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, সমসাময়িক অপরাধ ও জঙ্গীবাদ নিয়ে কথা বলতে পারবি, ক্লাসের ব্যবস্থা করছি”। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন স্টুডেন্ট নিয়ে ২ বছরে প্রায় ৪০ টি সেশনে ২৫০০ স্টুডেন্ট নিয়ে সরাসরি ক্লাস/ কর্মশালা করেছি। তাছাড়া পিটিআই ট্রেনিজ, পিডিবির প্রকৌশলী ট্রেনিজ, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে, পাবলিকেশন/ মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো- অনেকগুলো স্কুল কলেজে প্রোগ্রাম করেছি- সব উদ্দেশ্য ছিলো সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃস্টি করে প্রিভেন্টিভ পুলিশিং করা। ২০১৩-২০১৫ সাল, ময়মনসিংহ, ৭০ টির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের জন্য পরিচিত “পুলিশের সামাজিক আন্দোলনঃ ময়মনসিংহ মডেল” এর আলোকে কাজ করার চেষ্টা করেছি।

ব্যস্ততম কর্মস্থলের ধারাবাহিকতায় মাথায় ছিলো কি করে গুনগত সময় কাটানো যায়। এসএসপি (সিটিএসবি) হিসেবে Randomly কিছু সেবাপ্রার্থীকে অফিসে সৌজন্য সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকতাম, জানতে চাইতাম আপনি কি পুলিশ ভেরিফিকেশন/ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে পুলিশি সেবায় হেপি? বিভিন্নভাবে জিজ্ঞেস করে আনহেপি হলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতাম। এভাবে অনেককিছু আবিষ্কার করতেও পেরেছি। ২০১৭ সালে একদিন একজন সাক্ষাৎকার প্রার্থী (সম্মানিত রাবি শিক্ষক) ‘র সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করার পরামর্শ দিলেন। চিন্তা করলাম, আমি তো ডিগ্রি (বুয়েট) পাশ, মাস্টার্স করলে খারাপ হয় না।

ভাবলাম, কোন বিষয়ে করবো, Quantitative Analysis এর চেয়ে Qualitative Analysis কে আমি বেশি গুরুত্ব দিলাম অর্থাৎ এমবিএ করা কঠিন কিছু ছিলো না আমার জন্য। আমি বেছে নিলাম সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছি পুলিশে আসার শুরু থেকে। ১৯৯৭ সালে আমাদের পারিবারিকভাবে পুলিশি নির্যাতন/হয়রানির অভিজ্ঞতা থেকেই পুলিশ প্রফেশনকে বিসিএস এ ফার্স্ট অপশন দিই এবং পুলিশ ক্যাডারে ফার্স্ট পজিশন দখল করি। মানুষের সমস্যা বা ভিকটিমকে নিয়ে প্যাশেন্স হিয়ারিং দিই, সেই প্রবেশন পিরিয়ড বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানায় ৬টি স্কুল কলেজে ক্লাস/ কর্মশালা অনুষ্ঠান করেছিলাম। এরপর চিটাগং জেলার সীতাকুন্ড সার্কেল, খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় সার্কেল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফেণী, ময়মনসিংহ এ এসব কর্মসূচি করেছি। সামাজিক সমস্যা নিয়ে এমন কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিগতভাবে দেশের মানুষের সমস্যা/অপরাধ নিয়ে কাজ করার মানসে সোসাল ওয়ার্ক বিষয়ে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হই।

সিনিয়র কর্মকর্তা, আমার ব্যাচমেট অনেকে বলছিলেন, এমবিএ করলে কাজে লাগবে, সোসাল ওয়ার্ক পড়ে কোন কাজে লাগবে? যাক হোক, অনেক কিছু উপেক্ষা করে আমার মতো আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ধীরে ধীরে এন্জয় করতে লাগলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স স্যার ও অন্যান্য সম্মানিত শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের সাথে সচেতনতামূলক ক্লাস/ কর্মশালার মাধ্যমে আন্তঃসম্পর্ক সব মিলিয়ে ভালো সময় কাটছে। সেই সাথে ছাত্রছাত্রীদের ও সম্মানিত শিক্ষকদের সাইকোলজি/ সোশিওলজি সম্পর্কে ভালো ধারণা হয়েছে।

এ কোর্স করার কারণে সাইবার ক্রাইমের শিকার অনেক ছাত্রীদের (ভিকটিম) মানসিকভাবে চাঙ্গা করেছি, দুষ্টদের দুষ্টামি বন্ধ করতে পেরেছি, আমার ভালো লেগেছে, তারা (ভিকটিমরা) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। সাইবার ক্রাইমের ভিকটিমরা (ছাত্রীরা) আসতো রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী সিটি কলেজ, নিউডিগ্রী গভঃকলেজ, বরেন্দ্র কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী মহিলা কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষানগরীর অনেক প্রতিষ্ঠান হতে। তারা খুব বিমর্ষ হয়ে আসতো কেউ আসতো বন্ধুদের নিয়ে কেউ আসতো অভিভাবক নিয়ে আবার কেউ লজ্জায়/অপরাধবোধ থেকে বাবা-মাকে বলতে পারতো না। এখানে Social Work এর মৌলিক পদ্ধতি হিসেবে Case work পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে। যদিও আমরা সবাই Community organization পদ্ধতি বেশি প্রয়োগ করে থাকি। ডিসি (ডিবি) হিসেবে কাজ করতে গিয়েও অপরাধ সংশোধনের দার্শনিক ভিত্তি প্রবেশন স্টাইল (Probation Style) প্রয়োগের চেষ্টা করছি, সদ্য মাদকাসক্ত টিনেজদের শর্তসাপেক্ষে অভিভাবকসহ সাপ্তাহিক হাজিরার মাধ্যমে মুক্ত করে মাদকাসক্তি হতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা/কর্মচারী হিসেবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করতে ব্যক্তি সমাজকর্ম পদ্ধতি বেশি ফলপ্রসু ও কার্যকরী। তবে উচিতভাবে বলতে হয় যে, জনসেবা বা সমাজসেবার জন্য মনোভাবটাই আসল, সেবাপ্রার্থীদের সমস্যা ও তাদের প্রতি লাইকিং (Liking) থাকতে হবে প্রত্যেকটি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী/কর্মকর্তার, যেমনটি একজন প্রফেশনাল সোশ্যাল ওয়ার্কারের থাকতে হয়-কারণ প্রজাতন্রের/জনগণের অর্থে তাদের বেতন হয়।

যা হোক, যে বিষয়ে লেখা- আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো, মাস্টার্স এর চুড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ (3.82 out of 4.00). স্যাররা বলছেন, রেকর্ড ব্রে…।

অকপটে বলে রাখি আমি হাইপ্রোফাইলের অফিসার না, কারও হাইপ্রোফাইল নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথাও নেই। হাইএম্বিসাসের জন্য হাইক্যালকুলেশনেও আমার যোগ্যতা বা দক্ষতা নেই। যে যাই বলুক এসবের মাঝে আমার ছোট্ট জগতকে নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খারাপ সময় কাটছে না। সর্বোপরি আমি বিশ্ববিদ্যালয়কে আপন ভাবতে শুরু করেছি, দীর্ঘ ২ বছর অধ্যয়ন করায় ও এর প্রাকৃতিকলীলায় মত্ত হওয়ায়। এখন আমি ভাবি, আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের চেয়ে কম আপন কখনই নয় রাবি।

প্লেটোর শিক্ষাপদ্ধতি অনুযায়ী, “উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে”- সেই দিক থেকে এ কোর্সের মাধ্যমে জীবনবোধের উপলব্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
♥শ্রদ্ধেয় স্যারদেরসহ অশেষ কৃতজ্ঞতা সবার জন্য♥.

বিদ্রঃ এখন থেকে স্বেচ্ছাসেবী অলাভজনক এসজিএপি (SGAP) পদ্ধতিগতভাবে আরও সমৃদ্ধ হবে। যারা ভবিষ্যতে ভলান্টারি সচেতনতামূলক সোশ্যাল ওয়ার্ক বা সমাজকল্যাণমূলক কাজ করতে আগ্রহী তাঁরা ইনবক্সে যোগাযোগ করতে পারেন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১