,


শিক্ষা ও গবেষণার পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণে বেশি মনোযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের

উপচার ডেস্ক : একটি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টিতে কেমন অবদান রেখেছে, তার প্রতিফলন ঘটে সেখানে পরিচালিত হওয়া গবেষণায়। গবেষণা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলেও সেদিকে নজর কম দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। এ কারণে বিশ্বের এক হাজার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণার পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণেই মনোযোগ বেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।

গবেষণা পরিচালনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি হলেও প্রাপ্তি সে তুলনায় সামান্যই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশের মোট ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭টিতে কোনো গবেষণা প্রকল্পই পরিচালিত হয়নি। এর মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কোনো অর্থই বরাদ্দ করা হয়নি।

এদিকে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের ৪৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট ঘোষণা করে ইউজিসি। এর মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ দেয়া হয় মাত্র ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যদিও উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা।

ইউজিসি অনুমোদিত বরাদ্দের বাইরেও বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেয়া হয়েছে বড় প্রকল্প। উন্নত মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হয়েছে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প। গত বছরের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পাওয়ায় এ প্রকল্পের অধীনে বহুতল ভবনসহ ২০টিরও বেশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। একনেকের একই সভায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও (চবি) বাস্তবায়ন হচ্ছে ২৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ একাডেমিক ভবন, পঞ্চম একাডেমিক ভবনের চূড়ান্ত নির্মাণকাজ, দুটি হল ও হলের প্রভোস্টদের কোয়ার্টারসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন হবে। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলছে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও বাস্তবায়ন হচ্ছে ৩৪০ কোটি ১৩ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে ৩৫২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। যেখানে বিভিন্ন ভবন নির্মাণের পেছনে অধিকাংশ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে উদারহস্তে অর্থ ব্যয় করলেও গবেষণায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে ততটাই কার্পণ্য দেখাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

গত জুনে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৮১০ কোটি ৪২ লাখ টাকার বাজেট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট। পণ্য ও সেবা খাত এবং অন্যান্য অনুদান খাতের আওতায় গবেষণার জন্য মোট বরাদ্দ ৪০ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় ওই বাজেটে, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। যদিও আগের বছর বাজেটের ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ অর্থ গবেষণায় বরাদ্দ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির।

একই মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কার্যক্রম পরিচালনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ২৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। এ বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১ দশমিক ১৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের জন্য ৩৩৯ কোটি ১৮ লাখ টাকার বাজেট বরাদ্দ হয়েছে চবির জন্য। সেখান থেকে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে গবেষণা খাত উপেক্ষিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, গবেষণা ও অবকাঠামো দুটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর এ দুটি ক্ষেত্রেই আমাদের ঘাটতি রয়েছে। তাই গবেষণার জন্য যেমন অর্থ প্রয়োজন, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নেও অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।

দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছরই খোলা হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ। বাড়ছে শিক্ষক সংখ্যাও। যদিও এর কোনো প্রভাবই দেখা যাচ্ছে না গবেষণা ক্ষেত্রে। ভালো গবেষণা না থাকায় আন্তর্জাতিক মানের কোনো প্রকাশনাও বের হচ্ছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে।

এদিকে শিক্ষকদের উচ্চতর গবেষণায় উৎসাহিত করতে প্রতি বছরই পিএইচডি ফেলোশিপ দিয়ে আসছে ইউজিসি। যদিও কোনো বছরই ফেলোশিপের জন্য কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যায় না। ইউজিসির রিসার্চ সাপোর্ট অ্যান্ড পাবলিকেশনস বিভাগ (রিসাপ) সূত্রে জানা যায়, পিএইচডি ফেলোশিপের জন্য প্রতি বছরই দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে গবেষণা প্রস্তাবনা আহ্বান করে আসছে ইউজিসি। প্রতি বছর ১০০ জন করে এ ফেলোশিপ দেয়ার সুযোগ থাকলেও কোনো বারই এর সমপরিমাণ আবেদন পাওয়া যায় না।

ইউজিসি বরাবর সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। ওই বছরে ফেলোশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন ৮১ জন শিক্ষক। এর পরের বছর ফেলোশিপ দেয়া হয় ৬৮ জনকে, এর মধ্যে তা গ্রহণ করেছিলেন ৫৭ জন। ২০১৮-১৯ সেশনের ফেলোশিপের জন্য আবেদনের শেষ তারিখ ছিল গত ১৫ মার্চ। এ সময়ের মধ্যে আবেদন পড়ে মাত্র ৬৮টি। এর মধ্য থেকে নির্বাচিত হয় মাত্র ২২টি।

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন এ প্রসঙ্গে গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, আমরা সবসময় গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নতিতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পোস্ট ডক্টরেট করার জন্য শিক্ষকদের আমরা বেতনের সঙ্গে প্রতি মাসে আরো ৫০ হাজার করে টাকা দিচ্ছি। কিন্তু সেটার রেজাল্ট পাওয়া যায় না। তারা কেবল আমাদের একটা রিপোর্ট দেয়, তাতে কোনো পেপারস থাকে না। পুরো বছর তারা পিএইচডির মতো ছুটিতে কাটিয়ে সময় পার করে দেয়। আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে ৮০০ কোটি টাকা গবেষণার জন্য দিয়েছি। এর মধ্যে হাতেগোনা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কিছু টাকা খরচ করেছে।

ইউজিসির দেয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই বছর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৫০৪টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৭ সালে ২৮৪টি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালে গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ২০৭টি।

অন্যদিকে গবেষণা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৭ সালে গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যয়ের পরিমাণ ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গবেষণা ব্যয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আর ওই বছর তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) আওতায় এরই মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ইউজিসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা এ প্রকল্পটির মূল লক্ষ্যই ছিল গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। আবাসন ও শ্রেণীকক্ষ সংকটসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে অর্থ বরাদ্দ চাইতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

দেশের সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা ও গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছিল দুনিয়াজুড়ে। কিন্তু বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা খাতের অবস্থা নাজুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে ৪৫টির মতো। এর মধ্যে কিছু কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনই কোনো মৌলিক গবেষণা হয়নি। অথচ গবেষণাকাজে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে। এর বেশির ভাগই খরচ হয় সভা-সেমিনারে।

গবেষণাচিত্র হতাশাজনক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরও। এক শিক্ষাবর্ষের ব্যবধানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে এমফিলে ১১৬ ও পিএইচডি প্রোগ্রামে ৫১ জন গবেষক ভর্তি হন। আর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে এমফিলে ভর্তিকৃত গবেষকের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ ও পিএইচডিতে ২২। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গবেষণায় অংশগ্রহণের হার কমেছে ৫৮ শতাংশ। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ে অধিকাংশ বিভাগের নিজস্ব গবেষণাগার থাকলেও পূর্ণাঙ্গ গবেষণার জন্য নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম।

মূলত গবেষণায় দুর্বলতার কারণে বিশ্বের এক হাজার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে যে তালিকা প্রকাশ করে, সেটির সর্বশেষ সংস্করণে বিশ্বের ৯২টি দেশের ১ হাজার ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে এক হাজারের পর। শিক্ষার পরিবেশ (টিচিং), গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম (রিসার্চ), গবেষণার উদ্ধৃতি (সাইটেশন), এ খাত থেকে আয় (ইন্ডাস্ট্রি ইনকাম) ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ (ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক)—এ পাঁচটি স্তম্ভের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়।

সুত্র: বণিক বার্তা

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০