,


তৈদুছড়া ঝরনা

উপচার ডেস্ক: পাথরের ওপর মাথা রেখে চিত হয়ে শুয়ে আছি। আকণ্ঠ ডুবে আছি পানিতে। কেমন শিরশিরে একটা অনুভূতি। ঝরনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে শরীর ধুয়ে। কী ঠান্ডা একটা স্পর্শ। মুহূর্তেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। চারপাশে পাহাড়। ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ। থেকে থেকে ডেকে উঠছে নাম না জানা একটা পাখি। সঙ্গে তৈদুছড়া-১ ঝরনার মধুর আওয়াজ। ক্লান্তি দূর করার এর চেয়ে ভালো আর কী-ই বা আছে!

সাতজনের একটা দল এসেছি ঘুরতে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ের দেশে। পাহাড়ের কোলে কয়েকটা দিন কাটানোই উদ্দেশ্য। আগেই জেনেছিলাম পাহাড়ের ঝরনার রূপ সম্পর্কে। কিন্তু এত সুন্দর কল্পনাও করিনি। ঝিরিপথ ধরে হেঁটে আসার সময় মনে হচ্ছিল পৃথিবীর আদিম সময়ে চলে এসেছি। এখানে নেই কোন যান্ত্রিকতা, কোলাহল। নেই ব্যস্ততার লেশমাত্র। কেবলই প্রকৃতি আর তার চুল খোলা রূপ।

তৈদুছড়া ত্রিপুরা ভাষার শব্দ। বাংলা করলে চমৎকার একটি অর্থ দাঁড়ায়। পানির দুয়ার। তৈদুছড়া ঝরনা আবিষ্কৃত হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। পথ তাই এখনো বেশ দুর্গম। দল বেঁধে না এলে আনন্দের অনেকটাই মাটি হয়ে যাবে। ঘন জঙ্গল, পাহাড়ি রাস্তা, কখনো কখনো হাঁটুসমান কাদা এইসব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেলে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই আসার সময় অনেক সাবধান হয়েই আসতে হয়েছে আমাদের। ঝিরি পথের ঘণ্টাচারেক ট্র্যাকিং মনে থাকবে বহুকাল। যেই মুহূর্তে তৈদুছড়া ঝরনার দেখা পেলাম।

আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলাম কয়েকজন। কী এক আনন্দ সবার চোখে মুখে। পৃথিবী তার বেশিরভাগ সৌন্দর্যকে লুকিয়ে রাখে। সেটাকে উপভোগ করতে কষ্ট করতে হয় মানুষকে। মনে হলো সেই কাজটাই করেছি আমরা। মনে হলো এখানে একটাই বাক্য খাটে, ‘জুড়িয়ে দিল চোখ আমার, পুড়িয়ে দিল চোখ।’

এই ঝরনা দেশের অধিকাংশ ঝরনার মতো নয়। খাড়া পাহাড় থেকে ঝরে পড়ছে না। পাথরের গা বেয়ে তিনশ ফুট ওপর থেকে পড়িয়ে পড়ছে শুদ্ধ স্বচ্ছ জলের ধারা। অপূর্ব এক মূর্ছনাও সৃষ্টি হচ্ছে পানি আর পাথরের মিলনে। এই সুর মনকে উদাস করে দেয়। কেমন একটা ভাবালুতা কাজ করে ভেতরে। প্রকৃতির কাছাকাছি গেলে বুঝি এমনই হয়।

ডানপাশের পাথুরে পিচ্ছিল একটা পাহাড় পার হলেই দেখা মেলে তৈদুছড়া-২ ঝরনাটির। রূপ-লাবণ্যে কোনো অংশেই কম নয় সঙ্গীর থেকে। যেখানে ঝরনার পানি এসে পড়ছে জায়গাটি দেখলেই গোসল করতে মন চাইবে। আমাদের দলের সবাই একসঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ল জলে। এবড়ো-থেবড়ো, কাদামাখা পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে আসার কষ্ট ভুলে গেছে সবাই এক নিমিষে।

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় এই জোড়া ঝরনা দেখতে হলে একটু কষ্ট করতেই হবে। দীঘিনালা থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয় এখানে। এজন্য নিতে হয় প্রশাসনের অনুমতি। গাইড ছাড়া এখানে আসা কষ্টসাধ্যই। শরীর ফিট না হলে এই ঝরনা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে না করাই ভালো।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে বাসে করে খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন। ভাড়া ৬৫০ টাকার মধ্যেই। খাগড়াছড়ি থেকে চান্দের গাড়িতে করে যেতে হবে দীঘিনালাতে। প্রশাসনের সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করতে হবে। তারাই আপনাকে গাইডের ব্যবস্থা করে দেবে। গাইড আপনাকে পৌঁছে দেবে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য তৈদুছড়া ঝরনা দেখাতে। দিঘীনালাতে থাকার জন্য বেশ কিছু হোটেল এবং মোটেল রয়েছে। এরমধ্যে পর্যটন মোটেল, গিরি থেবার, হোটেল ইকোছড়ি উল্লেখযোগ্য।

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০